পৈতৃক নিবাস, তবুও ব্যস্ততার কারণে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে মুন্সীগঞ্জের দর্শনীয় স্থান কখনো ঘুরে দেখা হয়নি। তাই ছুটির দিনে বন্ধুরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভাণ্ডার মুন্সীগঞ্জ জেলা ঘুরে দেখার।
ভ্রমণের দিন ঠিক করা হলো। ঘুম থেকে উঠেই স্নিগ্ধ সকালে আমরা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে ঢাকা থেকে রওনা হলাম মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে। এবার আমার ভ্রমণসঙ্গী হলেন রুপন কণা, পূর্ণিমা, রুদ্রদীপ, কৌশিক, দীপ্তি, আশিক, মেহেদী, হিমেল, অনিক, আকাশ ও হৃদয়। আমাদের প্রথম গন্তব্য ইদ্রাকপুর কেল্লা। ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু পার হয়ে পৌঁছাই মুন্সীগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল পুরোনো কাচারি সড়কের পশ্চিম পাশে কোটগাঁও এলাকায়।
এখানেই মোগল স্থাপত্য ইদ্রাকপুর কেল্লা। কেল্লায় প্রবেশ করতেই অন্যরকম এক ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল আমাদের। কেল্লাটি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে ইট, চুন ও সুরকি। মোগল সুবেদার মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দে কেল্লাটি নির্মাণ করেন। সাড়ে ৩৫০ বছরের পুরোনো মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর কেল্লা। কেল্লার প্রাচীর শাপলা পাপড়ির মতো। সিঁড়ি দিয়ে আমরা সবাই মূল দুর্গের চূড়ায় উঠি। উপরে উঠেই অভিভূত হলাম এর অপূর্ব নির্মাণকাজ দেখে।
কেল্লাটির দৈর্ঘ্য ২১০ ফুট এবং প্রস্থ ২২৪ ফুট। কেল্লার পাশেই রয়েছে ইদ্রাকপুর ‘কেল্লা জাদুঘর’। ১০ টাকার টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করলাম আমরা। জাদুঘরে পোড়ামাটির মৃৎপাত্র, ঢাকনা, ল্যাম্পস্ট্যান্ড, কলম, পিরিচ, পাথরের টুকরা ও বিভিন্ন আলোকচিত্র দেখলাম।
কেল্লার ভেতরে শান বাঁধানো ঘাটে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম অতীশ দীপঙ্করের জন্মভিটা দেখতে। রাস্তার দুই পাশের গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে দেখতে জেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে বজ্রযোগিনী গ্রামে অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সে পৌঁছে গেলাম। ১০ টাকা ফি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। অতীশ দীপঙ্কর ৯৮২ খ্রীষ্টাব্দে বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মভিটায় আমরা দেখতে পেলাম বৌদ্ধরীতিতে একটি পবিত্র স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এটিকে দীপঙ্কর স্মৃতি বা অতীশ দীপঙ্কর শান্তিস্তূপ বলা হয়। স্তূপ ঘিরেই অবস্থিত পবিত্র উপাসনালয়। স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে রয়েছে কয়েকটি বৌদ্ধমূর্তি।
চীনা স্থাপত্যরীতি অনুসারে নির্মিত হয়েছে মন্দির ও গ্রন্থাগার। অতীশ দীপঙ্করের ভিটেমাটি পবিত্র ও শান্ত। স্তূপটি বর্তমানে বৌদ্ধসম্প্রদায়ের তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত।
আমরা এখান থেকে বেরিয়ে আবার রওনা হলাম প্রশান্তির খোঁজে। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ আলুখেত। মাইক্রোবাসে যেতে যেতে রোপণ করা গোল আলুগাছের জমি দেখে মন জুড়িয়ে গেল। রাস্তার দুই ধারে সবুজের সমারোহ। স্মৃতি ধরে রাখতে আলুখেতের পাশে মাইক্রোবাস থামিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন রুদ্রদীপসহ সব বন্ধু।
ছবি তোলার পর্ব শেষ করে আমরা আবার রওনা হলাম সোনারং-এর জোড়া মঠ দেখতে। আঁকাবাঁকা পথ ধরে ৩০ মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম টংগীবাড়ীর সোনারং গ্রামে। সোনারং জোড়া মঠ বাংলাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। সোনারং গ্রামের রূপচন্দ্র নামের এক বণিক দুই ধাপে মঠটি নির্মাণ করেন। বড় মঠটির উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার আর ছোট মঠটির উচ্চতা ১২ মিটার। মঠটি গোলাকার গম্বুজ আকৃতির। জোড়া মঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও মূলত এটি জোড়া মন্দির। অসাধারণ কারুকার্যমণ্ডিত সোনারং জোড়া মঠটি দেখে আমরা রওনা হলাম মাওয়ার শিমুলিয়া ঘাটে। ভরদুপুরে রোদের তেজ নেই, আকাশ মেঘলা। অলস সূর্য বেশ কিছুটা হেলে পড়েছে। তখন দুপুর ২টা। পেটে টান পড়ে। পেট শান্ত করতে আমরা চলে এলাম প্রজেক্ট হিলসায়। ইলিশের মতো দেখতে আকর্ষণীয় আধুনিক রেস্তোরাঁ ‘প্রজেক্ট হিলসা’।
দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা চলে এলাম পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত বাংলাদেশের দীর্ঘতম বহুমুখী সেতু ‘পদ্মা সেতু’ দেখতে। নদীর পাড়ে নৌকা ও বোট পাওয়া যায়। মাওয়া প্রান্তে শিমুলিয়া ঘাটে পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য দেখতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করলাম। সেতু ও নদীর আশপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ১০০০ টাকায় নৌকা ভাড়া করে ঘুরে দেখতে আবার বেরিয়ে পড়ি। নৌকায় বসে পূর্ণিমা গান ধরে- ও নদী রে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে...।
পদ্মা নদীর অনুপম সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে নৌকা ভাড়া করে পদ্মা নদীর বুকে ঘুরে বেড়াতে পারেন। প্রমত্তা পদ্মা নদীর তীরঘেঁষে গড়ে তোলা মাওয়ার বাঁধ এলাকায় শহরের ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান। শেষ বিকেলে পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন সূর্য অস্ত যাওয়ার মনোরম দৃশ্য। খোলা হাওয়ায় সময় কাটাতে চাইলে আসতে পারেন অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা মাওয়ার পদ্মার পাড়। বিনোদনবঞ্চিত দৈনন্দিন যান্ত্রিক জীবনে কিছুটা হলেও স্নিগ্ধতার পরশ মিলবে পদ্মা নদীর তীরে।
পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। অস্ত যাওয়ার ছবি ফ্রেমবন্দি করলাম ক্যামেরায়। এবার বিদায়ের পালা। কিন্তু মন যেন বিদায় নিতে চাইছে না। তবুও যেতে তো হবে। তাই আমরা সবাই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। বিক্রমপুর-মুন্সীগঞ্জ ভ্রমণের স্মৃতি মনের গহিনে থাকবে চিরকাল।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ যাওয়ার জন্য গুলিস্তান, গোলাপশাহ মাজার এলাকা, সায়েদাবাদ, ফুলবাড়িয়া, যাত্রাবাড়ী থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস কিছুক্ষণ পরপর ছেড়ে আসে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে। মুন্সীগঞ্জ সদরে যাওয়ার জন্য দীঘিরপাড় ট্রান্সপোর্ট, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট, বিআরটিসি ও বোরাক পরিবহনের বাস সরাসরি যায়। আর মাওয়াগামী রুটে ইলিশ, গাঙচিল, প্রচেষ্টা, গ্রেট বিক্রমপুর পরিবহনের বাস পদ্মা সেতুর মাওয়া এলাকায় শিমুলিয়ায় নিয়মিত চলাচল করে। তা ছাড়া ঢাকা থেকে মাইক্রোবাস একদিনের জন্য রিজার্ভ করে মুন্সীগঞ্জের দর্শনীয় স্থানগুলো সহজেই দেখে আসা যায়।
থাকা ও খাওয়া
মুন্সীগঞ্জে গিয়ে দিনে দিনেই ফেরা যায়। সাধারণত ছুটির দিনে খুব অল্প সময়ে ট্যুর করা যেতে পারে। মুন্সীগঞ্জে থাকার জন্য বেশকিছু রিসোর্ট ও হোটেল রয়েছে। জনপ্রিয়তায় মাওয়া রিসোর্ট, ঢালী’স আম্বার রিসোর্ট, এম জে হলিডে রিসোর্ট উল্লেখযোগ্য। সদরে হোটেল কমফোর্ট ইন ও সরকারি ডাকবাংলো রয়েছে। পদ্মা সেতুর মাওয়ার আশপাশে শিমুলিয়া এলাকায় বেশকিছু মাঝারি ও ভালো মানের স্থানীয় খাওয়ার হোটেল রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ ভ্রমণে এলে পদ্মার ইলিশ খাওয়া ছাড়া পরিপূর্ণ হয় না। হোটেলগুলোতে ইলিশ ভাজার সঙ্গে আরও রয়েছে বিভিন্ন রকমের ভর্তা এবং সঙ্গে বেগুন ভাজা। এখানকার ইলিশ ভাজা খুব সুস্বাদু।



