বার্ধক্য কেন আসে, কীভাবে তা ধীর করা যায় কিংবা আদৌ থামানো সম্ভব কি না— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গবেষণা চলছে। এবার এ বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির কথা জানালেন জার্মানির একদল বিজ্ঞানী।
জার্মানির University of Cologne-এর গবেষকদের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোষের ভেতরে জিন ট্রান্সক্রিপশনের গতি বেড়ে যায়, তবে সেই প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে কম নির্ভুল ও বেশি ভুলপ্রবণ। এই ভুল থেকেই ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ড. আন্দ্রেয়াস বেয়ার এই আবিষ্কারকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি একটি ‘মেজর ডিসকভারি’। তার মতে, এতদিন বিজ্ঞানীরা বার্ধক্য বিষয়ে মূলত কোন জিন সক্রিয় হচ্ছে আর কোনটি নিষ্ক্রিয় হচ্ছে—তা নিয়েই গবেষণা করছিলেন। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়াটিই যে ধীরে ধীরে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়ে, সে বিষয়টি এতদিন গুরুত্ব পায়নি।
ট্রান্সক্রিপশন হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোষ ডিএনএ থেকে আরএনএর কপি তৈরি করে। এই আরএনএ থেকেই পরে প্রোটিন তৈরি হয়, যা কোষের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে RNA Polymerase II নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম অতিরিক্ত দ্রুত কাজ করতে শুরু করে। এতে আরএনএ তৈরিতে ভুলের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ভবিষ্যতে নানা রোগের জন্ম দেয়।
কম ক্যালরির খাদ্যে মিলেছে ইতিবাচক ফল
আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ এবং ইনসুলিন সংকেত নিয়ন্ত্রণ করলে বিভিন্ন প্রাণীর আয়ু বাড়ে। এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কৃমি, ফলমাছি ও ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান। যেসব প্রাণীকে কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্য দেওয়া হয়েছিল বা ইনসুলিন সংকেত দুর্বল করা হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে ট্রান্সক্রিপশনের গতি ধীর হয়ে আসে এবং ভুলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ফলে এসব প্রাণীর আয়ু ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিপরীতে, জিন সম্পাদনার মাধ্যমে সেই ধীরগতির প্রক্রিয়া উল্টে দিলে তাদের আয়ুও কমে আসে। এতে প্রমাণিত হয়, ট্রান্সক্রিপশনের গতি সরাসরি বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িত।
মানুষের ক্ষেত্রেও মিলেছে একই ফল
গবেষকরা তরুণ ও বৃদ্ধ মানুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেও একই ধরনের ফল পেয়েছেন। এতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই প্রক্রিয়া শুধু প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের ক্ষেত্রেও কার্যকর।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ক্যানসারের মতো বয়সজনিত রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের নতুন দিকনির্দেশনাও পাওয়া যেতে পারে।
গবেষক ড. বেয়ারের ভাষায়, “এই গবেষণা আমাদের বার্ধক্যকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতে এমন চিকিৎসা বা প্রতিরোধমূলক পদ্ধতির পথ খুলে দিতে পারে, যা মানুষের সুস্থ জীবনকাল বাড়াতে সহায়ক হবে।” সূত্র: ইয়াহু
মেহেদী/