আজ ২১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’। সকালবেলার ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে বিকেলের আড্ডা, ক্লান্তি দূর করা কিংবা মন খারাপের মুহূর্ত এক কাপ গরম চা যেন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তো পানির পর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পান করা পানীয় হলো চা।বিশ্বজুড়ে চায়ের জনপ্রিয়তা কতটা বিস্তৃত, তা বোঝা যায় পরিসংখ্যানে।
প্রতিদিন পৃথিবীতে প্রায় ২০০ কোটির বেশি কাপ চা পান করা হয়। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫ হাজার কাপ চা পান করেন মানুষ। এই বিশাল শিল্পকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিশ্বের লাখ লাখ চা-শ্রমিক।
চা আবিষ্কারের সূচনা
খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালে চীনা সম্রাট শেন নাং গরম পানি পান করার সময় দুর্ঘটনাবশত কিছু চা পাতা পানিতে পড়ে যায়। সেই পানীয়ের স্বাদ ও সতেজতা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এভাবেই চা পান করার প্রচলন শুরু হয়।
প্রাচীন চীন যুগ, চায়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি
প্রথমে চা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে এটি ধীরে ধীরে দৈনন্দিন পানীয় হিসেবে পরিণত হয়। চীনের সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক জীবনে চায়ের বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়।
ইউরোপে চায়ের প্রবেশ
১৬১০ সালে ডাচ ব্যবসায়ীরা প্রথম ইউরোপে চা নিয়ে আসে। পরে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে চা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে চা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে পরিণত হয়।
বোস্টন টি পার্টি
১৭৭৩ সালে বোস্টন টি পার্টি ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ব্রিটিশ সরকারের করের প্রতিবাদে আমেরিকান উপনিবেশের মানুষ বোস্টন বন্দরে বিপুল পরিমাণ চা ফেলে দেয়। এটি পরবর্তীতে আমেরিকান বিপ্লবের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চা শিল্পের বিস্তার
১৯শ (১৮০১-১৯০০ সাল) ও ২০শ (১৯০১-২০০০ সাল) শতকে ইন্ডিয়া, শ্রীলংকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বড় বড় চা বাগান গড়ে ওঠে। লাখ লাখ শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে শ্রমিকদের কম মজুরি, দীর্ঘ সময় কাজ এবং খারাপ পরিবেশ নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয়।
আন্তর্জাতিক চা দিবসের ধারণা
২০০৪ সালে ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরামে চা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক চা দিবস পালনের প্রস্তাব আসে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল- চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা, ক্ষুদ্র চা চাষিদের সহায়তা করা এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
প্রথম আন্তর্জাতিক চা দিবস উদযাপন
২০০৫ সালে চা দিবস পালনের উদ্যোগ প্রথম নেয় চা উৎপাদনকারী কয়েকটি দেশ। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, উগান্ডা ও তানজানিয়ার মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। শুরুতে ২১ ডিসেম্বর দিবসটি পালন করা হলেও ২০১৯ সালে জাতিসংঘ ২১ মে তারিখটিকে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ২০২০ সাল থেকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সমর্থনে বিশ্বব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো চা শিল্পের উন্নয়ন এবং এই খাতের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা।
চা শুধু পানীয় নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও এর উপস্থিতি উজ্জ্বল। সংগীতেও চায়ের আবেদন চিরন্তন।
চায়ের ধোঁয়া ওঠা এক কাপ যেন শুধু পানীয় নয়, বরং সম্পর্ক, স্মৃতি, আড্ডা আর ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক। তাই বিশ্ব চা দিবসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অনেকেই স্মরণ করছেন এর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লাখো মানুষের শ্রম ও জীবনের গল্প। সূত্র: ডেজ অব দ্য ইয়ার
আমান/