এক ধরনের ক্লান্তি ভাব লাগছে শরীরে। হাত দুটি ঝাড়তে ঝাড়তে, ডানে-বায়ে শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে এসে দাঁড়ালাম পুকুরপাড়, আমগাছের নিচে। দখিনা বাতাসে পুকুরের সাদা পানিগুলো ছোট ছোট ঢেউ হয়ে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে এপারে। একটু প্রশান্তি লাগছে।
পুকুরের ওইপাশে আব্বার কবর। চারদিকটা দেখতে দেখতে চোখ পড়ল মরিচাধরা আমাদের চৌচালা, সামনে বারান্দা দেওয়া টিনের মসজিদটি। একটি মেয়ে বসে আছে মসজিদের সামনে। লাল রঙের শাড়ি, কালো একটি হিজাব, মুখে কালো মাস্ক। একটু কৌতূহল নিয়ে ভালো করে তাকালাম, চোখ দুটি চেনা চেনা মনে হচ্ছে। আয়ু না? হ্যাঁ আয়ুই তো। সাতপাঁচ না ভেবে চিলের মতো ছোঁ মেরে দৌড়ে যেতে লাগলাম। তার সামনে এসে দাঁড়াতে, সে তেমন অবাক হলো না!
আপনি? বললাম আমি।
সে উঠে দাঁড়াল, আমি জড়িয়ে ধরলাম আয়ুকে। মনে হচ্ছে কোনো শিমুল তুলার কোলবালিশ জড়িয়ে ধরেছি। তার গা থেকে বেরোচ্ছে একটা মেয়ে মেয়ে সুবাস। সুবাসে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমরা বসলাম।
কী অবস্থা আপনার? বলল আয়ু।
রুহের মালিক ভালো রেখেছে, কিন্তু আপনি এখানে? বললাম আমি।
এলাম আর কী। বুকের ভেতর কী জানি চাপা রেখে বলল আয়ু।
জানেন, শহরে আপনাকে রেখে আসার সেই রুক্ষ হৃদয়ে, এক পশলা বৃষ্টি এখন এল। একটু গম্ভীর কণ্ঠে বললাম।
মসজিদের বারান্দায় আমরা দুজন চুপ করে আছি। বললাম-
নতুন কবিতা কেমন লাগে আমার?
হুঁ, হ্যাঁ ছাড়া তেমন কোনো উত্তর পেলাম না। এবারের বইয়ের প্রচ্ছদ আয়ুর ছবি দিয়ে করা হচ্ছে, বলতে চেয়েও যেন বলতে পারলাম না। মনে হচ্ছে আমি মৃত্যুশয্যায়ী, তাই এই কথাটা মুখ দিয়ে বের করতে পারছি না।
একগুচ্ছ পাকা ধানের আঁটি নিয়ে মসজিদের বারান্দায় এসে দাঁড়াল আমার বয়সী একটি ছেলে। ঘামে এমন ভিজেছে, যেন এই মাত্র সরিষার তেল মেখে এসেছে।
ও আমার কাজিন, ওর খোঁজেই এসেছি। এ বলে পরিচয় করিয়ে দিল আয়ু। আমি কোলাকুলি করলাম। ছেলেটি টুঁ শব্দ না করে বেরিয়ে গেল।
চলুন ওকে খুঁজে আসি, বলল আয়ু।
মসজিদের পাশেই আমার সেই শূন্য ভিটা, যেখানে বসে শত শত কবিতা লিখেছি। ভাঙা ঘরটি পড়ে আছে এখনো, সংসারের কিছু টুমাটামি পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আহ্, কোথায় গেল সেই সংসারী মানুষগুলো? মনে হচ্ছে এই তো সেদিন আমাদের বাড়ি থেকে এক দৌড় দিয়ে যেতাম আমাদের ছোটো দাদার বাড়ি, ঠিক এই উঠানের ওপর দিয়েই।
আয়ুর মাঝে তেমন কোনো চঞ্চলতা দেখছি না। ও সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। আমি বললাম ওদিক দিয়ে যাবেন না, চলুন এদিক দিয়ে যাই। ওদিকে সাপ থাকতে পারে, আযু আমার কথা শুনল না। জঙ্গল মাড়িয়ে সাপের মতো কেল কেল করে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে একটা গুইসাপের কণ্ঠ পেলাম, গুইসাপটি বলল, ‘ঘুমিয়ে ছিলাম, নাহলে কত আগেই ক্ষতি করে দিতাম।’ আমি ঘাবড়ে গিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি, আয়ু অনেক দূর এগিয়ে গেছে পাকা ধানের আলপথ ধরে। কী হচ্ছে, গুইসাপ আবার কথা বলে নাকি! আমি হতভম্ব হয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। আয়ু কোথায় জানি মিলিয়ে গেল। আমি ওর নাগাল পেলাম না। কিন্তু কিছুদিন আগেই শুনেছি আয়ু অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। তাহলে কী আয়ু...
বিলাশপুর, জাজিরা
শরীয়তপুর
তারেক
.jpg)
.jpg)