ধরুন আপনি পৃথিবীতে থেকেই কোনো ভিনগ্রহে পা রাখলেন। যার পৃষ্ঠ বা ভূমি অন্যরকম। হয়তো ভাবছেন পৃথিবীতে থেকে কীভাবে ভিনগ্রহে পা রাখা যায়। হয়তো কৃত্রিমভাবে অথবা ভিনগ্রহের মাটি এনে তার ওপরে পা রাখলেই তা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীতে এমনই এক জায়গা আছে যেখানে গেলে মনে হয় অন্য কোনো গ্রহ।
এটি এমন একটি জায়গা যেখানে সালফারযুক্ত বুদবুদ, নিয়ন রঙের বিশাল লবণাক্ত সমতল ভূমি অবিরাম সূর্যের নিচে ঝিকিমিকি করে। এটি কোনো কৃত্রিম দৃশ্য বা স্থান নয়। এটি আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার ডানাকিল ডিপ্রেশন, যা পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত এবং চরম প্রতিকূল জায়গাগুলোর মধ্যে একটি।
ডানাকিল ডিপ্রেশন ইথিওপিয়ার এর্তা আলে পর্বতমালার উত্তর-পূর্বে, ইরিত্রিয়ার সীমান্তে এবং আফার (ডানাকিল) নিম্নচাপ নামক একটি ভূতাত্ত্বিক গঠনের ভেতরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩০ মিটার নিচু এই অঞ্চলটি পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্থান। আফ্রিকান এবং এশীয় টেকটোনিক প্লেটের মহাদেশীয় প্রবাহের ফলে ডানাকিলে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছিল।
প্রতি বছর ১-২ সেন্টিমিটার হারে প্লেটগুলো পৃথক হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা একটি ভূতাত্ত্বিক নিম্নচাপ রেখে যায়, যা ডানাকিল নিম্নচাপ (বা আফার নিম্নচাপ) নামে পরিচিত। এটি তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে আফার ট্রায়াঙ্গেলে অবস্থিত। এখানকার তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায়। এখানে বৃষ্টিপাত প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও এই ভূমি সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এবং অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক গঠনের জন্য বিখ্যাত।
এই অপার্থিব ভূখণ্ডে আছে বেশ কিছু জায়গা। এর মধ্যে ডালল হাইড্রোথার্মাল ফিল্ডকে বলা হয় নরকের প্রবেশদ্বার। ডালল হলো অ্যাসিড পুল, সালফার চিমনি এবং নিয়ন সবুজ এবং হলুদ সোপানের ভূখণ্ড। অঞ্চলটি ধাতু দ্রবীভূত করার জন্য যথেষ্ট অ্যাসিডিক এবং আয়রন অক্সাইড এবং সালফারের মতো খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ, যা অন্য জগতের রঙের বৈপরীত্য তৈরি করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, এটি বৃহস্পতির চাঁদ আইও বা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ডালল তার অনন্য ভূতাত্ত্বিক অবস্থার কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে রঙিন ভূমিরূপগুলোর মধ্যে একটি। সাদা লবণাক্ত সমতলের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে অন্ধকার আগ্নেয়গিরির পাথরের ওপর দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পরে, আপনি যখন উপরে পৌঁছাবেন তখন রঙের এই ভিন্ন জগতের আলোকিত আভা আপনার সামনে আসবে। ‘ধূমপান পর্বত’ নামে পরিচিত, এর্তা আলে নামে একটি আগ্নেয়গিরিও রয়েছে ডানাকিলে। জলন্ত ক্ষতিকারক গ্যাস দিয়ে ভর্তি এই আগ্নেয়গিরি লাল ও কমলা লাভা দিয়ে ভর্তি। তা ছাড়া ডানাকিলে আছে সমতল লবণাক্ত ভূমি।
ফাটল ধরা সাদা মরুভূমির মতো বিস্তৃত, ডানাকিলের লবণাক্ত সমতলগুলোর প্রাচীন কৌশল ব্যবহার করে আফার উপজাতির লোকরা প্রতিদিন মাটি খনন করে লবণের জন্য। লম্বা উটের কাফেলা মরুভূমি জুড়ে হাতে কাটা লবণের টুকরো বহন করে। যা সে দেশে ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গ্রহ বিজ্ঞানীদের কাছে ডানাকিল রহস্যময় জায়গা। ২০১৯ সালে গবেষকরা আবিষ্কার করেন যে ডাললের কিছু অংশে কোনো পরিচিত জীব টিকে থাকতে পারেনি। অদ্ভুত সুন্দর এই জায়গা যদিও পর্যটকদের জন্য আদর্শ স্থান নয়। তবুও অসংখ্য রহস্যপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমী ডানাকিলে ঘুরতে আসেন।
তারেক
.jpg)
.jpg)