অ্যান্টার্কটিকা এমন এক মহাদেশ, যেখানে পৃথিবীর বহু চেনা ধারণাই এসে ভেঙে পড়ে। এখানে দিক নির্ণয় কঠিন, ঋতুর হিসাব উল্টো, দিন-রাতের সীমা ঝাপসা- আর সময় যেন সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত। পৃথিবীর বাকি অংশে যেখানে সময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে শৃঙ্খলিত করে, সেখানে অ্যান্টার্কটিকায় সময় প্রায় একটি সমঝোতার বিষয়।
ভৌগোলিকভাবে অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর সব টাইম জোনের মধ্যদিয়ে বিস্তৃত। দক্ষিণ মেরুতে দাঁড়ালে তাত্ত্বিকভাবে আপনি পৃথিবীর সব টাইম জোনেই একসঙ্গে অবস্থান করছেন। কারণ সব দ্রাঘিমারেখাই এখানে এসে মিলিত হয়েছে। ফলে ‘এখন কয়টা বাজে’- এই সহজ প্রশ্নটির কোনো একক উত্তর অ্যান্টার্কটিকায় নেই। বাস্তবে এখানকার জীবন চলে ভিন্ন নিয়মে।
অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী কোনো আদিবাসী নেই, নেই কোনো জাতীয় সরকার বা কেন্দ্রীয় প্রশাসন। বিভিন্ন দেশের গবেষণা কেন্দ্রই এখানে মানব উপস্থিতির মূল ভরকেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশ নিজ নিজ গবেষণা স্টেশন পরিচালনা করে। প্রতিটি স্টেশন তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার জন্য সাধারণত নিজ দেশের টাইম জোন, অথবা নিকটতম সরবরাহ কেন্দ্রের সময় অনুসরণ করে।
এর পেছনে খুবই বাস্তব কারণ রয়েছে। গবেষণা স্টেশনগুলো বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ, রসদ সরবরাহ, বিমান চলাচল, বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদান- সবকিছুই নির্ভর করে নিজ দেশের প্রশাসনিক ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর ওপর। যদি তারা স্থানীয় কোনো কাল্পনিক সময় মেনে চলত, তাহলে সে যোগাযোগে অযথা জটিলতা তৈরি হতো। তাই সময় এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নয়, কার্যকারিতার ভিত্তিতে নির্ধারিত।
ফলে একই মহাদেশে, কখনো কখনো একই এলাকায় অবস্থিত দুটি গবেষণা স্টেশনে একই মুহূর্তে ভিন্ন ভিন্ন দিন বা রাত চলতে পারে। একটি স্টেশনে যখন সকালের নাশতা পরিবেশন হচ্ছে, পাশের আরেকটি স্টেশনে তখন হয়তো রাতের খাবারের প্রস্তুতি। সময়ের এ সহাবস্থান অ্যান্টার্কটিকাকে আরও অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এ বিভ্রান্তির সঙ্গে যুক্ত হয় প্রাকৃতিক আলোর চরম বৈচিত্র্য। গ্রীষ্মকালে এখানে সূর্য প্রায় ২৪ ঘণ্টাই দিগন্তের ওপরে থাকে, যাকে বলা হয় ‘মিডনাইট সান’। আবার শীতকালে টানা কয়েক মাস সূর্যের দেখা মেলে না। এই দীর্ঘদিনের আলো বা অন্ধকার মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়িকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ফলে সময় শুধু ঘড়ির কাঁটার ব্যাপার নয়, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
এ কারণে গবেষণা স্টেশনগুলো সময়সূচি নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম, খাবার, কাজ ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে গবেষকরা মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন। এখানে সময় মানে সূর্যের ওঠানামা নয়, বরং মানুষের তৈরি এক ধরনের শৃঙ্খলা।
মজার ব্যাপার হলো, দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত কিছু স্টেশন যেমন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামুন্ডসেন-স্কট সাউথ পোল স্টেশন, নিউজিল্যান্ডের সময় অনুসরণ করে। কারণ তাদের সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা মূলত নিউজিল্যান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ভৌগোলিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গায় থেকেও তারা সময়ের দিক থেকে যুক্ত থাকে আরেক মহাদেশের সঙ্গে।
অ্যান্টার্কটিকার সময়ব্যবস্থা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সময় আসলে একটি মানবিক নির্মাণ। আমরা সূর্য, পৃথিবীর ঘূর্ণন ও ছায়ার ওপর ভিত্তি করে একে সংজ্ঞায়িত করেছি, কিন্তু প্রয়োজনে সেই সংজ্ঞা বদলাতেও দ্বিধা করি না। অ্যান্টার্কটিকা সে বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)