১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সদ্য শেষ হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী তখন নতুন করে শক্তির ভারসাম্য গড়ে তুলছে। এমন সময় এক অভিনব বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের কয়েকটি স্কুলশিশু যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের হাতে তুলে দেয় একটি সুন্দর কাঠের খোদাই করা ‘গ্রেট সিল’— আমেরিকার জাতীয় প্রতীকখচিত এক শিল্পকর্ম। বাইরে থেকে দেখলে এটি নিছক উপহার। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এই উপহার পরিণত হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ে।
উপহারটি গ্রহণ করেছিলেন মস্কোতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাভেরেল হ্যারিম্যান। সুদৃশ্য কাঠের ফলকটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট সিলের অনুকরণে তৈরি— ঈগল, ঢাল, তীর ও জলপাই শাখা সবই নিখুঁত কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা। কূটনৈতিক সৌজন্যের নিদর্শন হিসেবে সেটি মার্কিন দূতাবাসের স্পাসো হাউসে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়। কেউ কল্পনাও করেনি, তা একদিন আমেরিকার কূটনৈতিক গোপনীয়তার সাক্ষী হয়ে উঠবে। আসলে ওই কাঠের সিলের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি; একটি ব্যাটারিবিহীন গোপন শ্রবণযন্ত্র। যন্ত্রটির নকশাকার ছিলেন রুশ বংশোদ্ভূত উদ্ভাবক লিওন থেরেমিন, যিনি তার ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ‘থেরেমিন’-এর জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সোভিয়েত নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশে তিনি তৈরি করেন এমন এক ডিভাইস, যা প্রচলিত বাগিং ডিভাইসের মতো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে এটি দীর্ঘদিন অদৃশ্য ও অচিহ্নিত থেকে কাজ করতে সক্ষম ছিল।
এই যন্ত্রটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দ্য থিং’। এটি ছিল এক ধরনের প্যাসিভ রেজোন্যান্ট ক্যাভিটি মাইক্রোফোন। বাইরে থেকে নির্দিষ্ট রেডিও তরঙ্গ পাঠানো হলে যন্ত্রটির অভ্যন্তরের পাতলা ধাতব ঝিল্লি কক্ষের শব্দতরঙ্গে কম্পিত হতো এবং সেই কম্পনের পরিবর্তন রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে প্রেরকের কাছে ফিরে যেত। অর্থাৎ, ডিভাইসটি নিজে কোনো সংকেত পাঠাত না; বরং বাহ্যিক তরঙ্গের প্রতিফলন ব্যবহার করত। এ কারণেই নিয়মিত তল্লাশি বা স্ক্যানিংয়ে এটি ধরা পড়েনি। দূতাবাসের ভেতরে আলোচনার সময় সোভিয়েত অপারেটররা বাইরে থেকে সংকেত পাঠিয়ে কথোপকথন শুনতে পেতেন।
প্রায় সাত বছর ধরে— ১৯৪৫ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই গোপন যন্ত্র মার্কিন দূতাবাসের অন্তরঙ্গ আলোচনার অনেকটাই মস্কোর কানে পৌঁছে দিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কোল্ড ওয়ারের সূচনালগ্নে যখন দুই পরাশক্তির মধ্যে অবিশ্বাস ও কৌশলী প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরমে, তখন এমন প্রযুক্তিগত গুপ্তচরবৃত্তি ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি কোনো কূটনৈতিক নিয়ম ভাঙেনি— উপহার দিয়েছে শিশুদের মাধ্যমে, আর যন্ত্রটি ছিল এতটাই অভিনব যে তা প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ছলনা করেছে।
১৯৫২ সালে এক আকস্মিক ঘটনার মধ্য দিয়ে রহস্যের জট খুলতে শুরু করে। মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দূতাবাসের রেডিও সিগন্যাল পর্যবেক্ষণের সময় অস্বাভাবিক প্রতিফলন শনাক্ত করেন। সন্দেহের সূত্র ধরে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত কাঠের গ্রেট সিলের ভেতর লুকিয়ে থাকা যন্ত্রটি আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কারের পর পশ্চিমা বিশ্ব বিস্মিত হয় সোভিয়েত প্রযুক্তির এই সূক্ষ্মতা দেখে। এটি ছিল ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী উদাহরণ।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে আরও কিছু বছর পর, যখন জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি সোভিয়েত গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলে এই ডিভাইসের অস্তিত্ব প্রকাশ করেন। তখন বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে নতুন করে নিরাপত্তাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়। দূতাবাস, কনস্যুলেট ও সরকারি ভবনগুলোতে ইলেকট্রনিক স্ক্যানিং ও টেকনিক্যাল সার্ভেইলেন্স কাউন্টারমেজার (TSCM) পদ্ধতি জোরদার করা হয়।
আজকের ডিজিটাল যুগে সাইবার নজরদারি, হ্যাকিং বা স্পাইওয়্যারের কথা আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু তার বহু আগেই কাঠের এক শিল্পকর্মের ভেতর লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র যন্ত্র দেখিয়ে দিয়েছিল- তথ্যই শক্তি, আর সেই তথ্য দখলের লড়াইয়ে সৃজনশীলতাই বড় অস্ত্র।
তারেক/
.jpg)
.jpg)