প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা মানেই পিরামিড, মমি আর রহস্যময় সব হায়ারোগ্লিফিকের হাতছানি। কিন্তু এসবের বাইরেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাদের এমন কিছু উদ্ভাবন ছিল, যা আজকের আধুনিক যুগেও আমাদের চমকে দেয়। যখন আল্ট্রাসোনোগ্রাফি কিংবা ল্যাবে রক্ত পরীক্ষার কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তখন মায়েরা কীভাবে জানতেন যে, তাদের গর্ভে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে বার্লির দানা আর গমের বীজে। যা প্রায় কয়েক হাজার বছর আগেকার এক অদ্ভুত অথচ কার্যকরী পদ্ধতির কথা বলে।
রহস্যময় প্যাপিরাস ও বীজের পরীক্ষা
ঊনবিংশ শতকে আবিষ্কৃত ‘বার্লিন প্যাপিরাস’ এবং অন্যান্য প্রাচীন নথিতে গর্ভধারণ পরীক্ষার এক অভিনব প্রক্রিয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু বিজ্ঞানের দিক থেকে প্রশ্নাতীত। কোনো নারী অন্তঃসত্ত্বা কি না! তা বুঝতে তাকে দুটি ভিন্ন পাত্রে মূত্রত্যাগ করতে বলা হতো। একটি পাত্রে রাখা হতো বার্লির দানা এবং অন্যটিতে গমের দানা। কয়েক দিন ধরে এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করা হতো এবং গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হতো পাত্র দুটিকে। প্রাচীন মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল যদি কোনো একটি পাত্রের বীজ থেকে চারা জন্মায় বা অঙ্কুরোদগম হয়, তবে নিশ্চিতভাবে বলা যেত যে সেই নারী অন্তঃসত্ত্বা। আর যদি কোনো পাত্রেই পরিবর্তন না আসত, তবে ধরে নেওয়া হতো তিনি অন্তঃসত্ত্বা নন।
লিঙ্গ নির্ধারণ: বার্লি বনাম গম
শুধু গর্ভধারণ শনাক্ত করাই নয়, প্রাচীন মিসরীয়রা ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণেও এই পদ্ধতি প্রয়োগ করত। এটি শোনার পর অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, যদি বার্লির দানা থেকে আগে অঙ্কুরোদগম হতো, তবে পরিবারে আগমন ঘটতে যাচ্ছে একটি কন্যাসন্তানের। আর যদি গমের দানা আগে ফেটে চারা বের হতো, তবে সেটি হতো পুত্রসন্তানের পূর্বাভাস।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে লিঙ্গ নির্ধারণের এ অংশটি খানিকটা লটারির মতো মনে হলেও, সে যুগের মানুষের কাছে এটিই ছিল একমাত্র ভরসা। মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চারা কেবল একটি পাত্র থেকেই গজিয়ে উঠত।
আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকেই ভাবতে পারেন এটি হয়তো নিছক কুসংস্কার। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তঃসত্ত্বার প্রস্রাবে ইস্ট্রোজেন হরমোনের আধিক্য থাকে, যা বীজের অঙ্কুরোদগম ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে গর্ভধারণ শনাক্ত করার বিষয়টি নির্ভুল ছিল। তবে সাধারণ প্রস্রাব বা পুরুষদের প্রস্রাবে থাকা উপাদান বীজের বৃদ্ধিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না।
বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন যে, প্রাচীন মিসরীয়রা হরমোন সম্পর্কে বিস্তারিত না জানলেও প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা উদ্ভিদের ওপর এর প্রভাব বুঝতে পেরেছিলেন। তবে একটি রহস্য আজও অমীমাংসিত যে, কেন বার্লিতে মেয়ে আর গমে ছেলে হবে? আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। লিঙ্গ নির্ধারণের এই অংশটি সম্ভবত মিসরীয়দের পৌরাণিক বিশ্বাস বা দৈব সংযোগের ফসল ছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আদিম প্রগতিশীল রূপ
প্রাচীন মিসরীয়রা যে কেবল স্থাপত্যে উন্নত ছিল তা নয়, তাদের চিকিৎসাবিদ্যাও ছিল সময়ের চেয়ে অগ্রগামী। এই বীজ পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, তারা প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে শরীরের গভীর সম্পর্ক অনুভব করতে পারতেন। আধুনিক গর্ভাবস্থা পরীক্ষার কিটগুলো যেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে মিসরের এই ‘জৈব কিট’ ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং সাশ্রয়ী।
মিসরীয় সভ্যতার এমন আরও বহু রহস্য আজও বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ বা নিরুত্তর, সেখানে কয়েক হাজার বছর আগের এই পদ্ধতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মেধা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কোনোকালেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
তারেক/
.jpg)
.jpg)