অটোনোমাস ড্রাইভিংয়ের প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল প্রতিযোগিতা। এই লড়াই মূলত হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও আইনগত কাঠামো- এই তিন ক্ষেত্রে চলছে। আমেরিকান বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে ‘ফুল সেলফ ড্রাইভিং’ (এফএসডি) সুবিধা চালুর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে অটোমোবাইল শিল্পের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠান ঝুঁকছে চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার প্রযুক্তির দিকে।
সম্প্রতি জানা গেছে, টেসলার পরবর্তী প্রজন্মের চিপ ‘এআই-৫’ আসতে দেরি হবে। ২০২৭ সালের আগে এটি গাড়িতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই বর্তমান সময়ে অটোনোমাস গাড়ির চিপের বাজারে টেসলার ‘হার্ডওয়্যার ৪’ (এআই-৪) ও এনভিডিয়ার ‘ড্রাইভ থর’- এ দুইয়ের মধ্যে মূল লড়াই চলছে।
প্রযুক্তিগত পার্থক্য ও সক্ষমতা
টেসলা ও এনভিডিয়ার চিপের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তাদের নির্মাণ প্রযুক্তি। এনভিডিয়া তাদের ‘থর’ চিপ তৈরিতে টিএসএমসির অত্যাধুনিক ৪-ন্যানোমিটার (৪এন) প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এই চিপে ব্ল্যাকওয়েল আর্কিটেকচার ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিশ্বের উন্নত ডেটা সেন্টারগুলোতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এনভিডিয়া তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি এতে দিয়েছে।
অন্যদিকে টেসলা কিছুটা সাশ্রয়ী পথ বেছে নিয়েছে। তাদের এআই-৪ চিপটি স্যামসাংয়ের ৭-ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এটি এনভিডিয়ার মতো অত্যাধুনিক না হলেও নির্ভরযোগ্য ও খরচ-সাশ্রয়ী।
কাগজে-কলমে এনভিডিয়ার চিপের গতি অনেক বেশি মনে হতে পারে। এনভিডিয়া থর প্রায় ২ হাজার টেরাফ্লপস গতি দিতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে টেসলার এআই-৪ চিপের গতি তুলনায় কম।
টেসলা এখানে একটি বিশেষ প্রকৌশল কৌশল খাটিয়েছে। গতির চেয়ে তারা মেমোরি ব্যান্ডউইথ বা তথ্যপ্রবাহ ক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছে। টেসলা তাদের চিপে জিডিডিআর-৬ মেমোরি ব্যবহার করেছে, যা সাধারণত গেমিং কম্পিউটারে দেখা যায়। এর ফলে সেকেন্ডে প্রায় ৩৮৪ গিগাবাইট পর্যন্ত তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব। তুলনায় এনভিডিয়ার ব্যান্ডউইথ সেকেন্ডে ২৭৫ গিগাবাইট।
টেসলা মূলত ক্যামেরানির্ভর প্রযুক্তিতে অটোনোমাস গাড়ি চালাচ্ছে। তাদের উচ্চ রেজল্যুশনের ক্যামেরাগুলো থেকে আসা বিপুল ভিডিও ডেটা প্রসেস করার জন্য এই অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
খরচ কমানোর বিষয়টি টেসলার প্রসেসর বা সিপিইউ নির্বাচনেও স্পষ্ট। এআই-৪ চিপে এখনো এআরএম কর্টেক্স-এ৭২ কোর ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রায় এক দশক পুরোনো প্রযুক্তি। কোরের সংখ্যা বাড়ানো হলেও প্রযুক্তিটি পুরোনো।
বিপরীতে এনভিডিয়া থর ব্যবহার করছে সার্ভার-মানের আধুনিক এআরএম নিওভার্স ভি৩এ সিপিইউ। এটি এতটাই শক্তিশালী যে শুধু গাড়ি চালানো নয়, গাড়ির ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, ড্যাশবোর্ড ও এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট সবকিছু একটি চিপ দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব। এ কারণেই বিওয়াইডি, জিকার, লুসিড এবং শাওমির মতো টেসলার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো এনভিডিয়ার চিপ বেছে নিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, টেসলা হয়তো দামের দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। নিজেদের প্রয়োজনমতো চিপ তৈরি করা নিঃসন্দেহে একটি বড় কৃতিত্ব। তবে অটোনোমাস গাড়ির সিলিকন চিপের বাজারে টেসলার আর একক আধিপত্য চলছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না।
টেসলা বর্তমানে তাদের এআই-৪ চিপের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করছে। লেভেল-৪ বা ৫ মাত্রার সম্পূর্ণ অটোনোমাস চালানোর জন্য যে ধরনের ‘রিডানডেন্সি’ বা বিকল্প ব্যাকআপ ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা টেসলার বর্তমান সিস্টেমে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে ২০২৭ সালে টেসলার নতুন চিপ আসার আগে রাস্তায় এনভিডিয়ার থর প্রসেসরযুক্ত কয়েক মিলিয়ন গাড়ি নামার সম্ভাবনা রয়েছে।