বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস স্বাস্থ্য খাতে দেশের প্রথম এবং একমাত্র বিশেষায়িত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর মিরপুরের দারুসসালামে নিজস্ব ক্যাম্পাসে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন প্রোগ্রামে পাঠদান এবং গবেষণা কর্ম পরিচালিত হয়। লিখেছেন মাহমুদ কবীর।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজি, ইমিউনোলজি শাখায় দক্ষ মানবসম্পদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি অপরিহার্য ল্যাবরেটরি সায়েন্স ও রেডিওলজি এবং ইমেজিং বিষয়ে প্রশিক্ষিত লোকবল। দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে চিকিৎসক যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিস্ট পেশাজীবীদের সংখ্যা বাড়েনি। বিষয়টি উপলব্ধি করে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বাস্থ্য খাতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিইউএইচএস প্রতিষ্ঠা ছিল মূলত প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিমের সুদূরপ্রসারী কর্ম পরিকল্পনার বাস্তব ও সময়োপযোগী প্রতিফলন।
২০০২ সালে ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। তবে নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা করা হয়। প্রথমে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস নামে একটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়। যেখানে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পাবলিক হেলথ প্রোগ্রামে এমফিল, এমপিএইচ ও হেলথ টেকনোলজি বিষয়ে বিএসসি ডিগ্রি প্রদান করা হতো। এর ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর মিরপুরের দারুসসালামে (টেকনিক্যাল মোড়ে) ছয় একর জায়গা নিয়ে নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্য খাতে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিইউএইচএস স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিষয়ে ১০টি অনার্স ও ১৫টি মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করেছে। সম্প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামে দুটি অনার্স প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি প্রোগ্রাম হেলথ সেক্টরে প্রয়োজনীয় লোকবলের চাহিদা বিবেচনা করে চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শিক্ষা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক মান সংরক্ষণ করছে এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে জনবলের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রতিটি বিভাগে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকদের সমন্বয়ে পাঠদান করা হয়। মানসম্মত ল্যাবরেটরিও সমৃদ্ধ লাইব্রেরিসহ বিস্তৃত সবুজ ক্যাম্পাসে গড়ে তোলা হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। যুগোপযোগী ও কর্মক্ষেত্রে চাহিদার আলোকে কোর্স-কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাহচর্যে জ্ঞান সৃষ্টি ও চর্চার মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয় মানবসম্পদ বিনির্মাণে কাজ করছে।
এ ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বিষয়ে বহুমাত্রিক প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষার জন্য একটি বিশেষায়িত বিদ্যাপীঠ। স্বাস্থ্য খাতে যুগোপযোগী চাহিদার আলোকে এখানে চারটি অনুষদের অধীনে প্রোগ্রামগুলো চালু রয়েছে। বেসিক সায়েন্সেস অনুষদে রয়েছে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড সেল বায়োলজি, মাইক্রোবায়েলজি ও ইমিউনোলজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম। চিকিৎসাসেবায় এই অনুষদের প্রতিটি প্রোগ্রাম অত্যাবশ্যকীয়। তাই, এসব প্রোগ্রামে পড়াশোনা করে সহজে উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ রয়েছে মেধাবী তরুণদের। হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের অধীনে রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং টেকনোলজি, ল্যাবরেটরি টেকনোলজি ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অনার্স এবং এপ্লায়েড ল্যাবরেটরি সায়েন্সেস বিষয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রাম করার সুযোগ রয়েছে।
বিইউএইচএসের পাবলিক হেলথ অনুষদে বেশ কিছু প্রোগ্রাম রয়েছে। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা বিষয়ে রিপ্রোডাকটিভ অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বিষয়ে কমিউনিটি নিউট্রিশন, রোগতত্ত্ব নির্ণয় ও নিরাময় বিষয়ে এপিডেমিয়োলজি অ্যান্ড বায়ো স্ট্যাটিসটিকস এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন সম্পর্কে ধারণাবিষয়ক হেলথ প্রোমোশন অ্যান্ড হেলথ এডুকেশন প্রোগ্রামে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।
পরিবেশের সঙ্গে সংগতি রেখে টেকসই স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে এখানে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনবিষয়ক অকুপেশনাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে। এ ছাড়া বিশেষভাবে, মেডিকেল প্রফেশনালদের অসংক্রামক নানাবিধ ব্যাধি হতে সুরক্ষামূলক নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস, ওষুধ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কমিউনিটি মেডিসিন এবং ডেন্টিস্টদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এমপিএইচ প্রোগ্রাম রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে সহায়ক জনসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এখানকার এলায়েড হেলথ সায়েন্সেস অনুষদে তিনটি প্রোগ্রাম রয়েছে। স্বাস্থ্য বিষয়ে যাবতীয় তথ্য গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য হেলথ ইনফরমেটিকস বিষয়ে মাস্টার্স করার সুযোগ রয়েছে, এতে করে অনেকে স্বাস্থ্য খাতে সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন। বায়োস্ট্যাটিসটিকস বিষয়ে এমএস করে স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চতর চাকরির সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি দেশ-বিদেশে চাকরি ক্ষেত্রে বিপুল চাহিদার বিষয়টি উপলব্ধি করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে অনার্স প্রোগ্রাম চালু করেছে বিইউএইচএস কর্তৃপক্ষ।
ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার সংগে সমন্বয় করে একাডেমিক ফি নির্ধারণ করেছে। উপরন্তু এখানে প্রতি সেশনে ভর্তি ক্ষেত্রে আর্থিক ছাড় দেওয়া হয়ে থাকে। এ ছাড়া মেধাবী এবং দরিদ্র, আদিবাসী ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, দেশব্যাপী ডায়াবেটিস ও সাধারণ চিকিৎসাসেবার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি সারা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তেমনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস যুগোপযোগী শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিশ্বে জায়গা করে নেবে, এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
সাক্ষাৎকার
'শিক্ষার্থীদের প্রতিবন্ধকতা দূর করে এগিয়ে যেতে হবে'

প্রফেসর ডা. ফরিদুল আলম
উপাচার্য, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস
খবরের কাগজ: আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে বলুন। বর্তমানে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টি অনুষদ, বিভাগ রয়েছে?
প্রফেসর ডা. ফরিদুল আলম: জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ ও উন্নত প্রযুক্তির প্রসারের ফলে বিগত কয়েক দশকে দেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, কিন্তু সেভাবে জনবল গড়ে ওঠেনি। বিইউএইচএস উচ্চতর স্বাস্থ্যশিক্ষা ও গবেষণা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে মানবসম্পদ বিনির্মাণে অন্যতম অংশীদার হবে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ বেড়েছে, যা খুবই আশাব্যঞ্জক। বিইউএইচএস দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরও উন্নত ও সুসংহত দেখতে চায়। এ জন্য যুগোপযোগী শিক্ষার মাধ্যমে দেশের তারুণ্যকে মেধাসম্পদে রূপান্তর করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। বিইউএইচএসে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিষয়ে ৪টি অনুষদের মাধ্যমে মোট ২৫টি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম চালু রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো প্রণোদনা আছে কি না?
প্রফেসর ডা. ফরিদুল: কোভিড-১৯জনিত সার্বিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ২০২০ সাল থেকে সব প্রোগ্রামে ভর্তি ফিতে ৫০ শতাংশ ও সব সেমিস্টারের টিউশন ফিতে ২৫ শতাংশ বিশেষ ছাড় চলছে, যা বর্তমান স্প্রিং সেশনেও চলমান রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে যাতে কোনো শিক্ষার্থী ঝরে না পড়ে, সে জন্য বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনারা কী ভূমিকা পালন করেন?
প্রফেসর ডা. ফরিদুল: চাকরির বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট তৈরিতেও বিইউএইচএস বদ্ধপরিকর। দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিইউএইচএস। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন, আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা চাকরি করে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। বিইউএইচএসের শিক্ষার্থীরা পাস করার পরই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। যেখানে সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা করে দেশ প্রতি বছর বেকারত্বের ভার বহন করছে সেখানে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ, সেখানে বিইউএইচএস থেকে পাস করে উচ্চবেতনে সম্মানজনক চাকরির সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি ইন্টার্নশিপ করা অবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তাব পান অনেক শিক্ষার্থী।
আপনাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণার সুযোগ কেমন? শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ কী করছেন?
প্রফেসর ডা. ফরিদুল: গবেষণা ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্ম বিভিন্ন দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক জার্নালে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়ে থাকে। নিয়মিত শিক্ষাক্রমের সঙ্গে ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয় সচেতনভাবে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেশি ও বিদেশি ফান্ড মিলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজে ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু বলুন?
প্রফেসর ডা. ফরিদুল: শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের লক্ষ্য হতে হবে অনেক ওপরে এবং সেই লক্ষ্যে তাদের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে তাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেক মানুষই সম্ভাব্যতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, সেটা যদি সে ব্যবহার করতে পারে তবে তার উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।
জাহ্নবী