দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচন জমে উঠতে শুরু করেছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কৌশলী ভূমিকায় প্রার্থীরা। নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে জোর দিয়েছেন তারা। ভোটারদের সঙ্গে করছেন কুশল বিনিময়। যদিও এমন কুশল বিনিময় আচরবিধির লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট করেননি নির্বাচন কমিশনার। এ ছাড়া আচরণবিধিতেও এ নিয়ে কোনো স্পষ্ট কিছু বলা নেই।
গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রাথমিক প্রার্থিতা চূড়ান্তের পর পরই শুক্রবার থেকে হলে হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রার্থীরা। ব্যতিক্রম ছিল না গতকাল শনিবারও। এদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ডাকসু ভিপি (সহসভাপতি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক উন্নতিতে দৃষ্টি দিতে চাই। আমরা হাসিনার অপসংস্কৃতির রাজনীতিকে ঘৃণা করি। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে কোয়ালিটিনির্ভর হবে, কোয়ান্টিটিনির্ভর নয়।’
বিকেলে ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থীরা। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় কাদা-ছোড়াছুড়ি নয়, ভালো কাজের প্রতিযোগিতার আহ্বান জানান ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম।
তিনি বলেন, ‘ক্রমাগত আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আমাদের বোনদের সাইবার বুলিং করছে। আমরা তাদের আহ্বান জানাব, আসুন আমরা ভালো কাজের প্রতিযোগিতা করি; মেধার প্রতিযোগিতা করি, নতুন আইডিয়া জেনারেট করি।’
ডাকসু পেছানোর চেষ্টার অভিযোগ, ছাত্র অধিকার পরিষদ প্যানেলের
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ডাকসু নির্বাচন পেছানোর চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্যানেল ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ ভোট ফর চেঞ্জ’। গতকাল বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করেন ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী বিন ইয়ামীন মোল্লা।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন নানান কৃত্রিম সংকটের মধ্য দিয়ে ডাকসু নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে। আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি প্রার্থীদের ছবি ও নাম হালনাগাদ করার জন্য। কিন্তু তারা বলছে এটা নিয়ে অনেক সমস্যা হবে। আমাদের বিশাল একটা ভোটার অনাবাসিক শিক্ষার্থী। আমরা যখন দাবি নিয়ে প্রশাসনের কাছে গেলাম, তারা বলছে হলকার্ড হালনাগাদ না করলে ভোট দিতে পারবে না।’
কোনোভাবেই ডাকসু বানচাল হতে দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনেক ফাইট করার পর ডাকসু আজ এ পর্যন্ত এসেছে। আমরা কোনোভাবেই ডাকসু নির্বাচন বানচাল হতে দেব না। যারা এ ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’
নির্বাচনে বাধা এলে তা প্রকাশ্যে আনার প্রতিশ্রুতি উপাচার্যের
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে কোনো ধরনের বাধা এলে তা প্রকাশ্যে আনার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান উপাচার্য।
তিনি বলেন, ‘নিখুঁত পরিবেশ আপেক্ষিক একটি বিষয়। এটি চলমান। ৯-১০ মাস ধরে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমরা সবাই মিলে মাঠে নেমেছি। সমস্যা আসছে, সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ছাত্রসংগঠনগুলো যে আচরণ করেছে তাতে আমরা আশাবাদী। মতভেদ, মতানৈক্য সত্ত্বেও তারা মোটা দাগে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আনন্দ ও উদ্দীপনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি আমাদের বিরাট একটি শক্তি। এটি এককভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বা একক কোনো মহলের বিষয় না। এই আয়োজনে যতক্ষণ সবাই আমার হাত ধরবেন, ততক্ষণ আমি মাঠে থাকব। যেখানে আমার হাত ছেড়ে দেবেন, আমি পরিষ্কার আপনাদের ডেকে বলে দেব যে এই জায়গায় আমার বাঁধা হচ্ছে।’
শিবিরের প্যানেল থেকে বাদ গেলেন এক প্রার্থী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়াকে ঘিরে শিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য প্রার্থী জয়েন উদ্দিন সরকার তন্ময়কে বাদ দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্র অধিকার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটের কথা মাথায় রেখে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের ক্রীড়া সম্পাদক ও সদস্য পদপ্রার্থী মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ জানিয়েছেন, তন্ময় ব্যক্তিগত কারণে প্যানেল থেকে সরে গেছেন। আগামী ২৫ আগস্ট পদটির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে আজ
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক প্রার্থিতা যাদের বাতিল হয়েছে তারা গতকাল শনিবার আপিলের সুযোগ পেয়েছেন। জানা গেছে, আজ রবিবার এসব আপিল নিষ্পত্তি করে প্রার্থীরা ফেরত পাবেন কি না, তা জানিয়ে দেবে কমিশন।
আচরণবিধির আওতায় আসতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশনা
ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি মানার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
গতকাল রাতে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ক্যাম্পাসে এবং আবাসিক হলে আগামী ২৬ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যক্তি অথবা সাংগঠনিক পরিচয়ে প্রচার কার্যক্রম চালাতে পারবে। প্রচারকাজ চালানোর নির্ধারিত দিনগুলোতে সামাজিক, আর্থিক, সেবামূলক সহযোগিতা বা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে না। এ ছাড়া এই দিনগুলোতে প্রার্থী বা প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে বা হলে মজলিস-মাহফিল আয়োজন করা কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বা প্রাঙ্গণে প্রচার চালানো যাবে না। এগুলো স্পষ্টত নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে এবং এ ক্ষেত্রে নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ধারা-১৭ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে।’
প্রসঙ্গত, প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় বৈধ প্রার্থী ৪৬২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ভিপি পদে ৪৮ জন। জিএস পদে ১৯ জন এবং এজিএস পদে ২৮ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে আগামী ২৬ আগস্ট প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ এবং সর্বশেষে ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।