রাকসু ভোটের প্রচার-প্রচারণা চললেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। পোষ্য কোটা ইস্যু এখনো সমাধান হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাত কার্যদিবসের আলটিমেটাম দিয়ে রেখেছেন।
এদিকে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় দৃশ্যমান বিচার চান জাতীয়বাদী শিক্ষকরা। এরমধ্যেই দুর্গাপূজার ছুটি শেষে রবিবার (৫ অক্টোবর) শুরু হয়েছে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম। ক্যাম্পাসে নতুন করে বইতে শুরু করেছে রাকসু নির্বাচনের হাওয়া।
তবে উদ্ভূত সংকট সমাধান না হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। পোষ্য কোটা পুনর্বহালের দাবি ও পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এরপর শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগ এনে শিক্ষকদের কর্মবিরতি এ শঙ্কার অন্যতম কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলনের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রশাসনের ওপর। আমরা দৃশ্যমান শাস্তি দেখতে চাই। যদি দৃশ্যমান কিছু না হয়, তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত জানাব। তবে রাকসু নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পোষ্য কোটাবিষয়ক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আমরা রাকসু নির্বাচন চাই। সুষ্ঠু, স্বাভাবিক সুশৃঙ্খলভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে রাকসু নির্বাচন হোক। আমরা চেষ্টা করব, রাকসু নির্বাচনে যেন বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু প্রশাসনের আন্তরিকতা থাকতে হবে।’
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলনের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রশাসনের ওপর। আমরা দৃশ্যমান শাস্তি দেখতে চাই, যদি দৃশ্যমান কিছু না হয়, তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত জানাব। তবে রাকসু নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে না। নির্বাচন যথারীতি হবে।’
ছুটির পর প্রচার শুরু
সরেজমিনে দেখা যায়, রবিবার দিনের শুরু থেকেই ছাত্রদল, ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলসহ অধিকাংশ প্রার্থী নবোদ্যোমে প্রচার কাজ শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে, টুকিটাকি চত্বর, পরিবহন মার্কেট, আমতলা, হল পাড়াসহ সবখানেই ভোটারদের কাছে তারা নিজেদের ইশতেহার ও ব্যালট নম্বরসহ লিফলেট পৌঁছে দিচ্ছেন। প্রচারে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন তাদের ব্যালট নম্বরটি ভোটারদের মনে করে দেওয়ার ব্যাপারে। তারা চেয়ে নিচ্ছেন দোয়া ও মূল্যবান ভোট। তবে সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় খোলায় এখনো সব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ফিরে আসেননি। তা ছাড়া বাধা ছিল ক্রমাগত বৃষ্টির। ফলে প্রার্থীরা বলছেন, প্রচার পুরোপুরি জমে উঠতে আরও দুই-তিন দিন লাগবে। প্রার্থীরা বলছেন, নির্বাচনের একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন ও পোষ্য কোটার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এখনো রয়েছে।
ছাত্রশিবির মনোনীত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজাসহ প্যানেলের একাংশ প্রচার চালিয়েছে কয়েকটি অ্যাকাডেমিক ভবন ও নবাব আব্দুল লতিফ হলে। তিনি বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগে তারিখ পরিবর্তন ও পোষ্য কোটার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা এখনো রয়েছে। ছাত্রদল মনোনীত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচার চালিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট ও তার আশপাশের এলাকায়। এ সময় প্যানেলের জিএস প্রার্থী নাফিউল জীবন সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য আমাদের দাবি ছিল দুর্গাপূজার পরে নির্বাচনের। কমিশন সে দাবিটি আমলে নেয়। বড় ছুটি শেষে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ বছর পর রাকসু নির্বাচন হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে আলাদা এটা উদ্দীপনা রয়েছে।’ সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদের প্রার্থীরাও চালিয়েছেন পরিবহন মার্কেট এলাকায়। প্যানেলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী সামসাদ জাহান বলেন, রাকসু নিয়ে অনেক টালবাহানা চলছে। তবে এটা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা এটা আদায় করে নেবেনই।
এদিকে নানা দাবি-দাওয়ার কারণে এ পর্যন্ত ছয়বার পরিবর্তিত হয়েছে রাকসু নির্বাচনের তফসিল। ২৫ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণের কথা থাকলেও ২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয়বারের মতো পিছিয়ে নতুন তারিখ ধরা হয় ১৬ অক্টোবর। তবে ওই তারিখ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কর্মবিরতি, সেটি ৯ তারিখের পর আবারও ফিরবে কি না, সেটি আমরা নিশ্চিত নই। আবার শিক্ষকদের যে দাবি শিক্ষার্থীদের বিচারের মুখোমুখি করা, সেটি শিক্ষার্থীরা মেনে নেবেন বলে আমাদের মনে হয় না। সব মিলিয়ে রাকসুতে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে একটা শঙ্কার জায়গা তো আছেই। তবে আমরা আশাবাদী থাকতে চাই।’
রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী মারুফ বলেন, ‘প্রথমত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, সেই ঘটনায় একপক্ষীয় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, আমরা সেটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। পাশাপাশি রাকসুকে জিম্মি করে আবারও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কর্মবিরতি, সেটি তারা শুরু করবেন বলে শুনতে পাচ্ছি। এমতাবস্থায় রাকসুর আকাশে এখনো কালো মেঘ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমরা আশা করব, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং প্রশাসন এ ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্বশীল আচরণ করবে।’
তবে নির্বাচন কমিশন তাদের নির্বাচনি প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এফ নজরুল ইসলাম বলেন, রাকসু নির্বাচন পেছানোর কারণে প্রচারের সময় বাড়ানো হয়েছে। ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত আচরণবিধি মেনে প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। এ ছাড়া ১৬ অক্টোবর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হচ্ছে। কর্মবিরতি না হলে রাকসুতে কোনো বাধা নেই।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষকদের দাবি অনুযায়ী একটি কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্যও আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, পোলিং এজেন্ট নিয়োগসহ শিক্ষকদের ভেতর থেকে দায়িত্ব পালন করার মতো কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। শিক্ষকদের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে ভিন্নতা না থাকায় শিক্ষক-কর্মকর্তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। যেহেতু আগামী ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের একটি বড় ইভেন্ট রয়েছে, সেখানে তাদের আর কর্মসূচিতে আসার কোনো শঙ্কা আমরা দেখছি না।’
গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রশাসন ১০টি শর্তে পোষ্য কোটা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। ২০ সেপ্টেম্বর জুবেরী ভবনে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতিতে যান। ফলে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় ২২ সেপ্টেম্বর জরুরি সভা করে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পিছিয়ে ১৬ অক্টোবর করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২৪ সেপ্টেম্বর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাত দিনের সময়সীমা দিয়ে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন এবং জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি স্থগিত করে।
রিফাত/