দীর্ঘ ৩৫ বছরের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে আজ বুধবার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন আজ। এ নির্বাচনে ১৩টি প্যানেল থেকে প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেলের মধ্যে।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাহিনী, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট সদস্যরাও দায়িত্বে থাকবে। এ ছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকবে, যারা প্রয়োজনে তিন মিনিটের মধ্যে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে।
ছাত্রশিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ নামে। প্যানেলটির ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি ও জিএস পদে সাঈদ বিন হাবিব। ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানো এবং বিভিন্ন হলে প্রভাব ধরে রাখার কারণে এই প্যানেলকে তুলনামূলক শক্তিশালী মনে করা হচ্ছে। ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি গতকাল মঙ্গলবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রত্যেক প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচার চালিয়েছেন। আমি আশা করছি সুন্দর শান্তিপূর্ণ চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে চবি প্রশাসনও সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
ছাত্রদলও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় ও জিএস প্রার্থী শাফায়াত হোসেন। সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানা আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। দীর্ঘ তিন যুগ ধরে চাকসু কার্যকর না থাকায় শিক্ষার্থীরা নানা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। হার জিত যাই হোক, আমরা ফলাফল মেনে নেব। শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার আদায়ে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকব।’
স্বতন্ত্র প্যানেলগুলোও রয়েছে শক্ত অবস্থানে। এর মধ্যে ‘বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য’, ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ ও ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে কয়েকটি প্যানেল আলোচনায় এসেছে। এই প্যানেলগুলোর অধিকাংশই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রত্যক্ষ ছায়ায় নয়, বরং স্বাধীন শিক্ষার্থী উদ্যোগে গঠিত।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, জাতিভিত্তিক সংগঠন ও স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীদের সমর্থিত পর্ষদ ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’। এ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ধ্রুব বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’
বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্যের ভিপি প্রার্থী জগলুল আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’ সর্বজনীন ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভিপি প্রার্থী সাঈদ মো. রেদোয়ান বলেন, ‘নির্বাচনি প্রচারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের প্যানেলের বিষয়ে বেশ ইতিবাচক ছিলেন। শিক্ষার্থীদের এই মনোভাব বজায় থাকলে আমাদের প্যানেলের অধিকাংশ প্রার্থীই জয়ী হবে।’
জুলাই আন্দোলনে আহত ও প্রথম সারিতে থাকা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করা হয়। এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মাহফুজুর রহমান। তিনিও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমর্থিত ‘দ্রোহ পর্ষদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ঋজু লক্ষ্মী খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনে যেই প্যানেল বা প্রার্থী জয়ী হোক না কেন ভবিষ্যতে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।’
একমাত্র নারী জিএস প্রার্থী শ্রাবণ
১৩টি প্যানেলের ভিপি ও জিএস পদে একমাত্র নারী প্রার্থী তাসনিম জাহান শ্রাবণ। তিনি বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল থেকে নির্বাচন করছেন। খবরের কাগজকে শ্রাবণ বলেন, ‘আমি যাদের কাছে গিয়েছি, সবার সাড়া পেয়েছি। আমি আশাবাদী। দেখা যাক।’
জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হলের বাইরের ভোটাররা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ২৭ হাজার ৫১৮ জন। শিক্ষার্থীর জন্য ১৪টি আবাসিক হলে আসন আছে ৬ হাজার ৩৬৯। তবে গাদাগাদি করে অনেকেই থাকেন বলে হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী থাকেন ক্যাম্পাসের আশপাশের কটেজ ও মেসে। ১০ থেকে ১২ হাজার শিক্ষার্থী থাকেন চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায়। এই শিক্ষার্থীদের কাছে যে প্যানেল সবচেয়ে বেশি পৌঁছাতে পেরেছে তাদের জয়ের পাল্লা ভারী হবে। মূলত শহর এবং আশপাশের উপজেলার শিক্ষার্থীদের ভোটের দিকে তাকিয়ে আছেন প্রার্থীরা।
ফেসবুকে ভোটের উত্তাপ
ক্যাম্পাসে প্রচার কার্যক্রম শেষ হলেও আরেক যুদ্ধ চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই আগ্রহী প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচার শুরু করেন। যা গতকাল নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। শেষ পর্যায়ে অনেককে বুস্ট পোস্ট করেও প্রচার চালাতে দেখা গেছে। অবশ্য কেউ কেউ ভোট চেয়ে ভোটারদের মোবাইল নম্বরেও ম্যাসেজ দিয়েছেন। বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ তৈরি হয়েছে যার মাধ্যমে নির্বাচন প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
নির্বাচনে মেধাবী, আন্তরিক, বাস্তবসম্মত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয়, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ও বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের আগ্রহ রয়েছে, এমন যোগ্য প্রার্থীকেই নেতৃত্বে বেছে নিতে চান তারা।
বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিসা ইয়াসমিন কারিমা বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস রুমগুলো আকর্ষণীয় না। আমি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন চাই। আশা করি যোগ্য প্রার্থীদেরই সাধারণ শিক্ষার্থীরা নির্বাচিত করবেন। যারা এসব সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
চারুকলা ইনস্টিটিউটের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী মো. আলী প্রিন্স বলেন, ‘ক্যাম্পাসে তো সমস্যার অভাব নেই। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে, এমন নেতৃত্ব আসুক। আমরা আশা করছি, যারা জয়ী হবেন তারা ক্যাম্পাস, শিক্ষার্থী সবার উন্নয়ন হয়- এমন সিদ্ধান্ত নেবেন।’
হল সংসদে প্যানেল দিয়েছে শুধু ছাত্রশিবির
হলগুলোতে ছাত্রশিবিরের ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ ছাড়া আর কেউ প্যানেল দিতে পারেনি। ছেলেদের হলগুলোতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং ছাত্রী হলগুলোতে তাদের সহযোগী সংগঠন ছাত্রীসংস্থা প্রত্যেক হলে প্যানেল দিয়েছে। এর বাইরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলে ‘স্বতন্ত্র নারী কণ্ঠ’ নামে একটি প্যানেল এবং প্রীতিলতা হলে ‘স্বতন্ত্র সম্প্রীতি প্যানেল’ নামে আরেকটি স্বতন্ত্র প্যানেল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
দেড় হাজারের বেশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করবেন। ইতোমধ্যে গতকাল সকাল থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও সুন্দর করতে কাজ শুরু করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আশা করি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হবে। নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে আমি কোনো ধরনের শঙ্কা করছি না।’
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ২৭ হাজার ৫১৬ জন। নির্বাচনে প্রার্থী রয়েছেন ৯০৮ জন। এর মধ্যে চাকসুর ২৬টি পদের বিপরীতে ৪১৫ জন, হল সংসদে ৪৭৩ জন এবং হোস্টেল সংসদে ২০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আজ সকাল ৯টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ভোট গণনায় ১২-১৪ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।




