বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি জীবজগতের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ শেখাও একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠেছে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি) অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা ক্যাম্পাসে বসবাসকারী পথ কুকুর ও বিড়ালদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও নিয়মিত খাদ্য প্রদানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃত সবুজ ক্যাম্পাসে বহু পথ কুকুর ও বিড়াল আশ্রয় নেয়। এরা যেমন ক্যাম্পাসের পরিবেশের অংশ, তেমনি অবহেলা ও ঝুঁকির মধ্যেও দিন কাটে তাদের। খাবারের অভাব, রোগব্যাধি, দুর্ঘটনা কিংবা মানুষের অসচেতন আচরণ সব মিলিয়ে পথপ্রাণীদের জীবন হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। এই বাস্তবতা থেকেই কিছু মানবিক চিন্তাসম্পন্ন শিক্ষার্থী একত্রিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন জাককানইবি অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।
এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসের প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং একটি নিরাপদ ও সহাবস্থানমূলক পরিবেশ গড়ে তোলা। সংগঠনটি নিয়মিতভাবে কুকুর ও বিড়ালদের খাদ্য বিতরণ করে, অসুস্থ প্রাণীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, টিকা প্রদান ও প্রয়োজন হলে নির্বীজন কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। পাশাপাশি প্রাণীদের ওপর নির্যাতন বা অবহেলার ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করে থাকে।
সংগঠনটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিব ইসলাম হৃদয় তার বক্তব্যে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা মানুষের মানবিকতা পরিমাপের একটি বড় মানদণ্ড। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, এই লক্ষ্যেই আমাদের কাজ। পথ কুকুর ও বিড়ালরা কারও বোঝা নয়, বরং এরা আমাদের নীরব প্রতিবেশী। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ঐশিক নূর জানান, শুরুর দিকে আমাদের কাজ ছিল খুব সীমিত। নিজ নিজ পকেটের টাকা খরচ করে কয়েকজন মিলে খাবার দিতাম। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সহযোগিতায় সংগঠনটি বড় হয়েছে। এখন নিয়মিত ফান্ড সংগ্রহ, ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সহায়তা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে আমরা আরও সংগঠিতভাবে কাজ করতে পারছি। আমাদের লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসকে প্রাণীবান্ধব একটি আদর্শ পরিবেশে রূপান্তর করা।
এই সংগঠনের প্রাণশক্তি হলো এর সক্রিয় সদস্যরা। এরকমই একজন সক্রিয় সদস্য সারা তাসনিম তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, ভোরবেলা বা গভীর রাতেও অসুস্থ কোনো কুকুর বা বিড়ালের খবর পেলে আমরা ছুটে যাই। অনেক সময় পড়াশোনা, পরীক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যেও এই দায়িত্ব পালন করি। যখন দেখি একটি অসুস্থ প্রাণী সুস্থ হয়ে আবার ক্যাম্পাসে দৌড়াচ্ছে তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। এই কাজ আমাদের ভেতর মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ আরও গভীর করেছে।
সংগঠনটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়, এটি নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রম ও নিজেদের উদ্যোগে যেভাবে পথ কুকুর ও বিড়ালদের খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আমি মনে করি, এমন মানবিক উদ্যোগকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ আমাদের সবারই সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা উচিত।
অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি শুধু খাদ্য বা চিকিৎসা সেবাতেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্যাম্পাসে পোস্টার, প্রচারাভিযান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে।
জাককানইবি অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি একটি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সংগঠন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে আরও সুন্দর ও সহমর্মিতাপূর্ণ করে তুলছে। প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থান যে শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল হতে পারে-এই সংগঠন তার বাস্তব উদাহরণ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মানবতা ও সাম্যের আদর্শকে ধারণ করেই এই সংগঠন নিঃশব্দ প্রাণীদের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলছে।
তাসনিম হক/নাঈম

