চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস)-এর মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। বিবৃতি প্রদান, অফিস কক্ষ বরাদ্দ, দায়িত্ব বণ্টন এবং কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাবকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চললেও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্টের মাধ্যমে তা প্রকাশ্য রূপ নেয়। এতে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের মাধ্যম চাকসুর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, দ্বন্দ্বের সূচনা হয় চাকসু থেকে দেওয়া একাধিক বিবৃতি ঘিরে। এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক অভিযোগ করেন, চাকসুর পক্ষ থেকে যেসব বিবৃতি প্রকাশ করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে তাকে অবহিত করা হচ্ছে না এবং মতামতও নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে ৩ নভেম্বর ২০২৫ সালে ‘জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি দিয়ে অবিলম্বে গণভোটের আয়োজন করে রাষ্ট্রসংস্কারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্তির আহ্বান চাকসু’র’ শিরোনামের বিবৃতিকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ওই বিবৃতির পক্ষে চাকসুর অধিকাংশ প্রতিনিধি মত দিলেও এজিএস এতে আপত্তি জানান এবং চাকসু থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন।
পরবর্তীতে এজিএস নিজের প্যাড ব্যবহার করে ‘পতিত শক্তির ষড়যন্ত্রে বিপন্ন দেশ: উত্তরণের পথ জাতীয় ঐক্য’ শিরোনামে একটি ফেসবুক পোস্ট ও বিবৃতি দেন। এতে করে জিএস ও এজিএসের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। জিএসের অভিযোগ, পদাধিকার বলে চাকসুর প্যাড ব্যবহার করে বিবৃতি দেওয়ার এখতিয়ার কেবল সাধারণ সম্পাদকের; এজিএস এভাবে বিবৃতি দিতে পারেন না।
এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয় চাকসু কার্যালয়ের রুম বরাদ্দকে কেন্দ্র করে। এজিএস অভিযোগ করেন, তাকে না জানিয়ে জিএস নিজের রুম পরিবর্তন করেন এবং তার আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে জিএস বলেন, এটি পূর্বের ক্যাবিনেট অনুযায়ী কাজের প্রয়োজন বিবেচনায় করা হয়েছে এবং এজিএসকে বরং ছোট রুম থেকে বড় রুমে বসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভর্তি পরীক্ষাকালে চাকসুর বিভিন্ন কার্যক্রমে এজিএসের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জিএস পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এজিএস নিয়মিত মিটিং ও কার্যক্রমে অংশ নেননি বলেই দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি। অপরদিকে এজিএসের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়েছে এবং অনেক সময় শেষ মুহূর্তে বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য ডাকা হয়।
এবারের চাকসু নির্বাচনে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতেই জয়ী হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘বৈচিত্রের ঐক্য’-এর প্রার্থীরা। ব্যতিক্রম শুধু দুটি পদ। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) হিসেবে জয়ী হয়েছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক। অন্যদিকে ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্যানেল থেকে মাহবুবা প্রীতি। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী ভিন্ন রাজনৈতিক প্যানেলের প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি শুরু থেকেই ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যা বর্তমান দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে চাকসুর কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও হতাশা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অঙ্গন নেত্রী সুমাইয়া শিকদার বলেন, ‘চাকসুর মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা। কিন্তু বর্তমানে চেয়ার ও রুম নিয়ে দ্বন্দ্ব, অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন এবং পারস্পরিক বিরোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
তিনি বলেন, ‘২৬টি পদের মধ্যে ২৪টি একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের হাতে থাকায় চাকসুর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।’
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের দ্বন্দ্বে ব্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে চাকসু থেকে শিক্ষার্থীরা কোনো বাস্তব সুফল পাচ্ছে না।’
এ বিষয়ে চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘চাকসুর কোনো সিদ্ধান্ত বা বিবৃতি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নিয়মিত অবহিত করা হয় না।’
তিনি বলেন, ‘চাকসু থেকে যদি কোনো বিবৃতি যায়, তাহলে তা সম্পাদক, ভিপি, জিএস ও এজিএসসবার জানা থাকা উচিত। যেহেতু তার মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে, তাই তিনি স্বাধীনভাবে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন। রুম বরাদ্দ ও কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিই মূলত তার আপত্তির জায়গা।’
অন্যদিকে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাইদ বিন হাবিব বলেন, ‘এজিএসের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই।’
তিনি বলেন, ‘এজিএস চাইলে চাকসুর সব কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারেন। ভর্তি পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রমে তার অনুপস্থিতির কারণেই দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
বিবৃতি দেওয়ার এখতিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পদাধিকার বলে চাকসুর প্যাড ব্যবহার করে বিবৃতি দেওয়ার ক্ষমতা কেবল সাধারণ সম্পাদকের।’
মাহবুবা প্রীতির ক্ষেত্রেও একই রকম আচরণ করা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে প্রীতি এ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘তিনি চাকসুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা বিবৃতি সংক্রান্ত বিষয়ে জড়াতে চান না। তার মূল কাজ খেলাধুলা নিয়ে। বিশেষ করে মেয়েদের খেলাধুলার উন্নয়ন কীভাবে করা যায়, সেটিতেই তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন। অন্যান্য বিষয়ে তিনি খুব একটা যুক্ত হন না বলেও জানান।’
এ বিষয়ে চাকসুর সহ-সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, ‘জিএস ও এজিএসের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত।’
তিনি জানান, প্রয়োজন হলে চাকসু সভাপতির উপস্থিতিতে উভয় পক্ষকে বসিয়ে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চাকসু সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার বলেন, ‘বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে বৈঠক কিছুটা পিছিয়েছে। বৈঠকের পর এ বিষয়ে জানানো হবে।’
উল্লেখ্য, আজ ১২ জানুয়ারি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দোসর হাসান মোহাম্মদ রোমানের পুনর্বাসন, চাকসু নেতাদের সাইবার বুলিং ও নিয়োগ ইস্যুতে আয়োজিত চাকসুর সংবাদ সম্মেলনে এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক উপস্থিত ছিলেন না।
আরাফ/রিফাত/




