কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭৫ একর ক্যাম্পাসের ঠিক কোল ঘেঁষেই প্রকৃতির কোমল নৈসর্গিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা সবুজ ক্যাম্পাস প্রাচীরের বাইরের গ্রামীণ জীবনে দুই পা রাখলেই ক্লান্তি যেন পাখির ডানায় ভর করে উড়ে চলে যায়। প্রকৃতির যেকোনো সৃষ্টিই অত্যন্ত নিখুঁত হয় বলে যেকোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য সহজেই আমাদের মন কাড়ে।
শরীর জুড়ানো হাওয়ার সঙ্গে গাছের দুলতে থাকা, দিবাকরের সঙ্গে মেঘমালার লুকোচুরি খেলা, হালচাষের সময় কাদামাটিতে বকপাখিদের কোলাহল যেন কোনো বিখ্যাত শিল্পীর স্বপ্নের ক্যানভাসে আঁকা ছবির জীবন্ত প্রতিফলন।
বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মাঝে শুধু আঁকাবাঁকা হয়ে বুক চিরে চলেছে ছোট একটি খাল। খালের দুপাশে অসংখ্য কলাগাছের সারিতে প্রায় সারা বছরই ফলন হয়। ছোট খালটির জলে রয়েছে পুঁটি, টাকি, মলা-ঢেলাসহ দেশীয় সব মাছের সমাহার। নীল রঙের মাছরাঙা সারাক্ষণই ওঁৎ পেতে থাকে ডুব-সাঁতার দিয়ে মাছ শিকারের জন্য। বেজি, বনবিড়াল, শিয়াল, গন্ধগোকুলসহ ছোট ছোট বন্যপ্রাণীর চলাফেরা হরহামেশাই চোখে পড়ে। নিবিড় ঘন পাতার মাঝে টুনটুনি পাখির বাসা দেখা যায়।
সারা বছরই ব্যস্ত থাকে এ অঞ্চলের মাটি ও মাটির মানুষেরা। পাখিডাকা ভোরে ঘুম ভাঙতেই শুরু হয় মাটির সঙ্গে তাদের একাত্মতা। হালের বলদ বা ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা, কোদাল হাতে মাটি কাটার কাজ, দক্ষ হাতের কারুশিল্পের মতো ফসল রোপণ করা, দেখাশোনা করা ইত্যাদি। নিজস্ব জমিতে সন্তানের ন্যায় পরম মমতায় চাষাবাদ করে হরেক রকমের সবজির। উর্বর মাটিতে তাদের স্বপ্নের সোনার ফসল ফলতে দেখলে সার্থকতার হাসি ফুটে ওঠে।
আরও রয়েছে বিভিন্ন ফলদ বৃক্ষ ও কাষ্ঠল উদ্ভিদ। ফসল বা প্রয়োজনীয় যেকোনো পণ্য বহনে এখানকার কৃষক এখনো মহিষের গাড়ির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
গৃহস্থ বাড়িতে দেখা যায় ফুলের বাগান করতে ও নানা জাতের ফলের গাছ লাগাতে। সেই সঙ্গে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করতে দেখলে মনে হয় প্রতিটি বাড়ির পরিসীমা যেন সাজানো ছোট এক টুকরো পৃথিবী। গোধূলি বেলায় ক্যাম্পাসের মীর মুগ্ধ সরোবরের ওয়াচ টাওয়ারে উঠে যতদূর চোখ যায়, অস্তমিত লাল আভার মাঝে নিজের আত্মাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রকৃতি এখানে মানুষের শিকড়ের সন্ধান দেয়। কিছুক্ষণ খোলা প্রান্তরে বসলেই প্রকৃতির নীরব নিশ্বাস অনুভব করা যায়। মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের উঠোন পেরিয়ে ছুটে আসে প্রকৃতির সঙ্গে কথোপকথন করতে, ছবি তুলতে, নতুন নতুন গল্প শুনতে।
দৈনিক ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার ব্যস্ততা থেকে পালিয়ে প্রকৃতির কোলে গিয়ে বসে বিশ্রাম নেয়। সবাই এক সঙ্গে গানের আসর বসাতে, পিকনিক করতে ও আড্ডা দিতে দেখা যায়। মাথার ওপরে তুলোর মতো সাদা মেঘ আর নিচে আঁকাবাঁকা জমির আইলের মাঝে সবুজের সমারোহ মনকে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখা ও শৈশবকে কাছ থেকে দেখার আদর্শ এক জায়গা।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া