‘কালকে দুপুরে এক বেলা ভাত খেতে পারব? রাতে না খেলেও সমস্যা নেই…’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক সংগঠন উত্তরণের ইনবক্সে রোজার আগে পাঠানো এক শিক্ষার্থীর বার্তা এটি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই উত্তর আসে, ‘অবশ্যই পারবেন। দুই বেলাই খাবেন। যতদিন সমস্যায় থাকবেন, ততদিন খাবেন।’
এই কথোপকথন কোনো গল্পের নয়। এগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক শিক্ষার্থীর ক্ষুধার, সংকটের এক নিঃশব্দ আঙুলের ছাপ।
‘দুই-তিন দিন যদি খেতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। আজ রাতে খাইনি। বাড়ি থেকে টাকা খুঁজতে বিবেকে বাধে।’
উত্তরণের সদস্যরা জবাব দেয়, ‘প্লিজ আপনি ডাইনিংয়ে খেতে থাকুন। উত্তরণের খাতায় স্বাক্ষর করে যতদিন ইচ্ছা, ততদিন খেতে থাকুন। ফোন নম্বর দিন, রাতে খাবারের ব্যবস্থা করি।’
এই নীরব চাহিদার নিয়েই রোজার ভেতরে ও সেহরি ও ইফতার বিতরণের কাজ করছে উত্তরণ চবি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই অলাভজনক সংগঠন ক্যাম্পাসের অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।
উত্তরণ শুধুই খাবার বিতরণ করে না। এখন তারা সেহরি ও ইফতার বিতরণের পাশাপাশি চালাচ্ছে রক্তদান কর্মসূচি, পার্টটাইম টিউশন, আইটি প্রশিক্ষণ, বৃত্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী তাদের সহায়তা পেয়েছেন। শতাধিক শিক্ষার্থী টিউশন সেবার মাধ্যমে আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। দেশের সব শ্রেণির শিক্ষার্থী আসেন এখানে। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবার থেকে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় টিউশন বা পার্টটাইম কাজ করতে যাওয়া-আসায় সময় যায় প্রায় দুই ঘণ্টা। এতে হারিয়ে যায় একাডেমিক সময়। আবার সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত টিউশন নেই। ফলে অনেকে মাসের শেষে না খেয়ে থাকেন, কেউ দিনে একবেলা খেয়ে থাকেন।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে প্রায়ই অ্যানোনিমাস পোস্ট দেখা যায়- ‘কেউ কি একটি টিউশন ম্যানেজ করে দিতে পারবেন? যে কোনো কাজ করতে পারব, কেউ কি কোন কাজ দেবেন?’
এই সংকটের ভেতরেই নিরবভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করে কাজ করছে উত্তরণ। রোজার মাসে তারা চালাচ্ছে বিশেষ ইফতার ও সেহরি কার্যক্রম। চারটি হলে টোকেন সিস্টেমের মাধ্যমে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মাঝে সেহরি বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী হলের ক্যাফেটেরিয়ায় প্রতিনিয়ত ইফতারসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। শুধু একটি মেসেজেই শিক্ষার্থী সাহায্য নিতে পারে।
উত্তরণের আয়োজক গিয়াসউদ্দিন রক্সি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ চার বছর ধরে কাজ করছি। যেসব শিক্ষার্থীর খাবার বা শিক্ষাবৃত্তি সমস্যা হয়, তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। রমজানে ইফতার ও সেহরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, ক্যাম্পাসে কেউ আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষা বা অন্য সমস্যায় পড়বে না।’
সংগঠনটির সদস্য তাসনীম আইয়ান বলেন, ‘উত্তরণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম। যারা মুখ ফুটে আর্থিক সংকট বলতে পারে না, তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। প্রতিদিন ২৪–২৫টি ইফতার পৌঁছে দিচ্ছি। চারটি হলে টোকেনের মাধ্যমে সেহরি বিতরণ করছি। তবে ফান্ড সীমিত। আরও বেশি সাহায্য পেলে আরও অনেক শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াতে পারব।’
কিভাবে সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছেন? এই প্রশ্নে উত্তরণের সদস্য মোকাদ্দেস হোসেন জানান, স্বেচ্ছাসেবক দল সরাসরি গিয়ে খাবার পৌঁছে দেয়। শিক্ষার্থীর নাম, স্টুডেন্ট আইডি ও অবস্থান জানালেই তারা পরিচয় গোপন রেখে সহায়তা পৌঁছে দেয়।
শুধু রোজার নয়, সারা বছর উত্তরণ মেয়েদের দুটি এবং ছেলেদের দুটি হলে দুপুর ও রাতে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। গত জানুয়ারিতেই চারটি হলে মিলিয়ে ৩১৫টি মিলের বিপরীতে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা তারা পরিশোধ করেছে।
এই গল্প শুধু খাবারের নয়, এটি ক্যাম্পাসের এক নীরব সংগ্রামের গল্প। শিক্ষার্থীরা হয়তো মুখে বলতে পারে না, কিন্তু তাদের ক্ষুধা, সংকট ও মর্যাদার বার্তা একটি ছোট্ট বার্তাই প্রকাশ পায়। সেই বার্তাকেই উত্তরণ পৌঁছে দিচ্ছে সাহায্যের হাত।
অমিয়/


