বিচারক হওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। তাও আবার আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হওয়া। সেই কঠিন জায়গায় যদি একজন নারী নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন, তা বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। আর প্রথমবারের মতো এই বিস্ময়কর কাজ যিনি করেছিলেন, তিনি রোজালিন হিগিন্স। আন্তর্জাতিক আদালতের প্রথম নারী বিচারক ছিলেন তিনি। তার পুরো নাম রোজালিন সি কোহেন। জন্ম ১৯৩৭ সালের ২ জুন।
রোজালিনের শিক্ষাজীবন ছিল অসাধারণ। তিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গারটন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে নিউইয়র্কের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তার উচ্চশিক্ষা তাকে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে গভীর দক্ষতা প্রদান করে, যা তার পুরো কর্মজীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
আইনজীবী হিসেবে হিগিন্সের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। তিনি প্রথমে লন্ডনের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ছিলেন। এ সময় রোজালিন আন্তর্জাতিক সুরক্ষা, মানবাধিকার, শরণার্থী আইন এবং জাতিসংঘের কার্যক্রম নিয়ে নিবিড় গবেষণা করেন। তার তাত্ত্বিক এবং গবেষণামূলক কাজগুলো তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন সম্মানিত আইন বিশেষজ্ঞ হতে সাহায্য করে।
১৯৯৩ সালে রোজালিন হিগিন্স ‘International Law and the Avoidance, Containment and Resolution of Disputes’ নামে একটি বই লিখেন; যেটি জাতিসংঘের শান্তি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি প্রধান রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়। হিগিন্স সবসময়ই জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সমর্থন করেছেন এবং তার কাজগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ১৯৯৫ সালে হিগিন্সকে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এটি তার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। আন্তর্জাতিক আদালতের প্রধান ভূমিকা হচ্ছে রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরামর্শমূলক মতামত দেওয়া। হিগিন্স তার বিচারিক কাজে যথাযথ সততা, নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। তার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালত জটিল মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘ সনদের বিভিন্ন ধারার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণী দক্ষতা ছিল অসাধারণ।
২০০৬ সালে রোজালিন হিগিন্স আন্তর্জাতিক আদালতের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এই পদে তিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার সভাপতিত্বকালে তিনি মানবাধিকার, শরণার্থী সমস্যা এবং যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে অনেক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার করেন। তার নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আদালত বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যায় আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। হিগিন্সের কাজগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আইনানুগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রোজালিন হিগিন্সের বিচারিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার আন্তর্জাতিক আইনে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করা। তিনি শুধু আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক হিসেবেই নয় বরং নারী হিসেবেও তিনি অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে তিনি একটি নতুন যুগের সূচনা করেন, যেখানে নারীরা বিচার ব্যবস্থার শীর্ষ পদ লাভ করতে পারে।
রোজালিন হিগিন্স তার অসাধারণ অবদানের জন্য বহু সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘ডেম’ উপাধি লাভ করেন এবং বহু সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পান। তার কাজের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। হিগিন্সের প্রকাশিত বই এবং প্রবন্ধগুলো আজও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে গবেষণা এবং অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৭ সালে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য ‘বালজান’ পুরস্কার লাভ করেন। তার দক্ষতা অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। তিনি কমপক্ষে ১৩টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি, ইয়েল ল স্কুল অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট এবং ম্যানলে ও হাডসন পদক পেয়েছেন।
জাহ্নবী
.jpg)