কুমিল্লার মানুষের কাছে একসময় ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত কুমিল্লা চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদের মধ্যে জমি নিয়ে জটিলতার কারণে চিড়িয়াখানাটি আর চলছে না। সেখানে এখন শাকসবজি আবাদ করা হচ্ছে। ফলে বিনোদনবঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। শহরের মধ্যে একমাত্র ধর্মসাগরপাড় ছাড়া কোথাও আর ঘুরে বেড়ানোর জায়গা মিলছে না।
একসময় জেলার একমাত্র চিড়িয়াখানাতে ২৪টি পশুপাখির মধ্যে তিনটি চিত্রা হরিণ, একটি ময়ূর, আটটি বিভিন্ন প্রজাতির বানর, তিনটি বাজপাখি, দুটি মেছোবাঘ, একটি অজগর, দুটি খরগোশ, একটি কালিম পাখি ও তিনটি তিতির পাখি ছিল। দর্শনার্থীদের আনাগোনায় মুখর থাকত বোটানিক্যাল গার্ডেনটিও। স্থানীয়রা জানান, নগরীর কালিয়াজুরী মৌজায় জেলা প্রশাসকের বাংলোর পাশে সরকারি খাস খতিয়ানের ১০ দশমিক ১৫ একর জমিতে ১৯৮৬ সালে জেলা প্রশাসক আবদুস সালামের প্রচেষ্টায় এবং জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিত্তশালীদের সহযোগিতায় বিনোদনপিপাসুদের জন্য গড়ে তোলা হয় বোটানিক্যাল গার্ডেনটি। এর এক কোণে করা হয় চিড়িয়াখানা।
ওই সময় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জেলা পরিষদ এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরে জেলা প্রশাসন চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব জেলা পরিষদকে দেয়। সেই থেকে এই দুই বিনোদন কেন্দ্রের দেখভাল করে আসছিল জেলা পরিষদ। তারাই চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ইজারা দিয়ে আসছিল।
এই জমির মালিক জেলা প্রশাসন হলেও ব্যবস্থাপনার যাবতীয় দায়িত্ব ছিল জেলা পরিষদের। জেলার ১৭টি উপজেলা থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসতেন কুমিল্লা চিড়িয়াখানায়। কিন্তু করোনা মহামারিতে ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
এরপর জেলা পরিষদ থেকে জায়গাটি বুঝে নেয় জেলা প্রশাসন। শুরু করে শাকসবজির চাষাবাদ। চিড়িয়াখানার জায়গাটি বুঝে নেওয়ার পর এর বড় একটি অংশে নগরীর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শাকসবজি চাষের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই থেকে স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন।
স্থানীয়রা জানান, চিড়িয়াখানাটি তত্ত্বাবধানে নেওয়ার পর বড় একটি অংশে ২০২১ সালের শেষদিকে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক শাকসবজির বাগান করেন। ওই সময় প্রায় ৬০ প্রকারের সবজি উৎপাদন হয় এই বাগানে। বর্তমানেও সেখানে শাকসবজির চাষ করা হচ্ছে। এতে জেলা প্রশাসক লাভবান হলেও কুমিল্লাবাসী বঞ্চিত হচ্ছেন বিনোদন থেকে।
সরেজমিন দেখা গেছে, কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন এখনো ঘুরে বেড়ানোর জন্য চিড়িয়াখানায় আসেন। কিন্তু ফটক বন্ধ দেখে ফিরে যান তারা।
চিড়িয়াখানা ফটকের সামনের দোকানি মহরম মিয়া জানান, করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকেই চিড়িয়াখানা বন্ধ রয়েছে। মানুষজন ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। এখনো অনেকে না জেনে এখানে ঘুরতে আসেন। গেট বন্ধ দেখে মুখ বেজার করে ফিরে যান।
নগরীর ছোটরা এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হাসান জানান, একসময় বিনোদনপ্রেমীদের পদচারণে মুখর থাকত চিড়িয়াখানা এলাকা। শহর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা থেকে নানা বয়সী লোকজন এখানে ঘুরতে আসত। একটু স্বস্তির আশায় শহরবাসীও এখানে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু তা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। চিড়িয়াখানাটি আবার চালু করার দাবি জানান তিনি।
কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, কুমিল্লা জেলায় ৬০-৭০ লাখ মানুষের বসবাস। তাদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা প্রয়োজন। এখানে মহাপরিকল্পনা নিয়ে আরও দৃষ্টিনন্দন চিড়িয়াখানা ও বিনোদনকেন্দ্র তৈরি করে মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত।
মানুষের দাবির মুখে সম্প্রতি জেলা পরিষদের এক মতবিনিময় সভায় চিড়িয়াখানার জায়গাটি মৌখিকভাবে জেলা প্রশাসকের কাছে ফের বরাদ্দ চেয়েছেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান বাবলু। তিনি বলেন, ‘একসময় চিড়িয়াখানাটি জেলা পরিষদের অধীনে ছিল। সঠিক পরিচর্যা ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে সেটি বিলীন হয়েছে। এখানকার মানুষের বিনোদনের কথা চিন্তা করে চিড়িয়াখানাটি আবার চালু করা হোক। মানুষ তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু স্বস্তির জায়গা পাবে।
তাই আমি জেলা প্রশাসকের কাছে অনুরোধ করব যেন জেলা পরিষদের মাধ্যমে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনটি চালু করা হয়। আমরা এ প্রতিষ্ঠানটিকে স্মার্ট বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলব।’ তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কুমিল্লার জেলা প্রশাসক খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান।
এমএ/