ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডগুলোতে হঠাৎ নেমে আসে অন্ধকার। ভেন্টিলেটর বা জরুরি যন্ত্রপাতির অ্যালার্মের শব্দে চারদিকে তৈরি হয় এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি।
হতাশা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কামরুল হাসান বলছিলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে চরম দুর্ভোগে পড়েন এখানে ভর্তি থাকা রোগীরা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হয় ডাক্তারদের। বিশেষ করে সিজারের রোগী বা শিশু- সবারই বিদ্যুৎ না থাকার ফলে সমস্যা ও অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়।
শুধু হাসপাতাল নয়, এই স্থবিরতার শিকার পুরো উপজেলার অর্থনীতি। বিবিরহাট বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি সাইয়েদ মো. ইলিয়াছ খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে কলকারখানা থেকে শুরু করে বাজারের প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মোবাইল টাওয়ার ও ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। তাতে ব্যাংকিং লেনদেন থেকে শুরু করে সাপ্লায়ারদের সাথে যোগাযোগ সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়ে। একদিকে জেনারেটরের বাড়তি খরচ, অন্যদিকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও অন্ধকার হয়ে থাকায় বেচাকেনায় ধস নামে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎহীন প্রতিটি দিন আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য চরম লোকসান ডেকে আনে।
কিন্তু কেন ফটিকছড়ির লাখো মানুষের জীবনযাত্রা প্রতিনিয়ত এমন স্থবিরতার মুখে পড়ছে?
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ফটিকছড়ি। অথচ এই উপজেলার অর্থনীতি, কৃষি এবং সাধারণ জনজীবন একটি সুতোর ওপর ঝুলছে। ফটিকছড়ির সদর ও এর আশপাশের সকল ইউনিয়নের বিদ্যুৎ সরবরাহের একমাত্র নাভিকেন্দ্র হলো হাটহাজারী গ্রিড স্টেশন থেকে আসা ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইন। কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি সাব-ট্রান্সমিশন লাইনের জন্য এত দীর্ঘ দূরত্ব কেবল অকার্যকরই নয়, বরং এই একটিমাত্র একমুখী লাইনের ওপর সমগ্র উপজেলার নির্ভরতা ফটিকছড়িবাসীর জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভোগান্তির কারণ।
এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের পেছনের কারিগরি দিকটি স্পষ্ট করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্চয় বড়ুয়া। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ফটিকছড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল মাধ্যম হাটহাজারী গ্রিড থেকে আসা ৩৮ কিলোমিটারের এই লাইনটির কোনো ব্যাকআপ সংযোগ নেই। ফলে সুদীর্ঘ এই লাইনের কোথাও সামান্য ত্রুটি দেখা দিলে পুরো উপজেলা তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কারিগরি নিয়মানুযায়ী, ৩৩ কেভি লাইনের জন্য ৩৮ কিলোমিটার দূরত্ব অত্যধিক বেশি। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে লাইনের ইম্পিডেন্স বেড়ে গিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে মারাত্মক ভোল্টেজ ড্রপ ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ফটিকছড়িতে আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন বিকাশমান শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে। বিদ্যুতের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, কিন্তু বিতরণ সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ছেনা। অতীতে যে লোডের কথা মাথায় রেখে সঞ্চালন লাইনের তারগুলো টানা হয়েছিল, বর্তমানে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি লোড পড়ছে। এতে তারগুলো মাত্রাতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে সিস্টেম লস এবং যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের এই ভয়াবহতা ফটিকছড়ির দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রাইস মিল, চা-বাগান এবং তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। উৎপাদন সচল রাখতে মালিকদের বাধ্য হয়েই জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এতে জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ হচ্ছে।
শুধু দীর্ঘ লাইনই নয়, প্রকৃতির বৈরিতা এবং ত্রুটিপূর্ণ সরঞ্জামও এই ভোগান্তির বড় কারণ। রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা এই দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনটি প্রায়ই বজ্রপাত ও ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ে। সময়ের সাথে সাথে এর ভেতরের লোহার পিনে মরিচা ধরে তা ফুলে ওঠে। ভেতরের এই প্রবল চাপে ইনস্যুলেটরগুলো প্রায়ই ফেটে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
যান্ত্রিক ত্রুটি ও প্রকৃতির বৈরিতার পাশাপাশি এই ভোগান্তির মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে কর্তৃপক্ষের সনাতন ব্যবস্থাপনা। ফটিকছড়ি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর প্রকৌশলী মো. ফয়সাল বলেন, সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, ৩৮ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ লাইনে কোথায় ত্রুটি হয়েছে তা শনাক্ত করার জন্য আধুনিক কোনো ফল্ট প্যাসেজ ইন্ডিকেটর (এফপিআই) না থাকায় সমস্যা চিহ্নিত করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে রাতের বেলা বা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে লাইনম্যানদের মাইলের পর মাইল হেঁটে বা গাড়িতে করে ত্রুটি খুঁজতে হয়। একটি সাধারণ ত্রুটি সারাই করতেও টানা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়, আর সাধারণ মানুষকে এই পুরোটা সময় কাটাতে হয় অন্ধকারে। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ লাইনে ঝড়-বৃষ্টিতে গাছপালা ভেঙে পড়ে এবং তার অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার কারণে প্রচুর ভোগান্তি পোহাতে হয়।
অন্যদিকে, এই সংকটের পেছনে নিম্নমানের সরঞ্জামের দায়ও কম নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, মালামাল ক্রয় এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) হাতে। তারা টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পল্লীবিদ্যুতের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যে সরঞ্জাম সরবরাহ করে, তার অনেকগুলোরই গুণগত মান অত্যন্ত নিম্ন। এই নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহের কারণেই বারবার লাইনে ত্রুটি দেখা দেয়। আর এর চূড়ান্ত ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে পল্লীবিদ্যুতের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের
আশপাশের উপজেলাগুলোর তুলনায় উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা ফটিকছড়িবাসী আটকে আছেন ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এক জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইনের ফাঁদে। নিম্নমানের সরঞ্জাম আর কর্তৃপক্ষের সনাতন পদ্ধতির বলি হচ্ছেন হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগী থেকে শুরু করে চা বাগান, প্রান্তিক ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ। একটি বিকল্প গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণ ও আধুনিক ফল্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপন আজ লাখো মানুষের বেঁচে থাকার ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মূল দাবিতে পরিণত হয়েছে।
নাজমুল আলম/থিও