কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ২০২২ সালের নভেম্বরে খুলনায় হাই-টেক পার্কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। নানা জটিলতায় প্রকল্পটি শুরুতেই হোচট খায়। পরে অবশ্য কাজ শুরু হয়। তবে নির্মাণকাজ এখন পুরোপুরি বন্ধ।
ভারতীয় ঋণে চলমান এ প্রকল্পটি গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। মূলত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘লার্সেন অ্যান্ড ট্যুরগো’-এর (এলএনটি) কর্তাব্যক্তিরা নিরাপত্তার অজুহাতে দেশে ফিরে যাওয়ার পর থেকেই কাজ বন্ধ রয়েছে।
এরই মধ্যে নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের বিদায় দেওয়া হয়েছে। চার পাশে টিন দিয়ে ঘেরা হাই-টেক পার্কের মূল ফটকের পাশে কাজের বিররণী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা সাইনবোর্ড সাদা রঙ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। গুটি কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী মূল ফটক তালাবদ্ধ রেখে ভেতরে অবস্থান করেন। কবে থেকে আবার নির্মাণকাজ শুরু হবে তাও কেউ বলতে পারছেন না।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় স্টিল স্ট্রাকচারের সাততলা ভবনের মাত্র তিনতলা পর্যন্ত অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। চারতলার অবকাঠামো আংশিক নির্মাণ করার পরই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখনো ভবনের বাকি তিনতলা নির্মাণ, একটি সিনেপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, বাউন্ডারি ওয়াল, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজব্যবস্থা, ওয়াকওয়ে, নলকূপ স্থাপন, অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ ও ইলেকট্রো মেকানিক্যাল কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৭০ কোটি টাকার প্রকল্পের এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। ফলে বাকি ৬৪ শতাংশ কাজ শেষ করা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় ঋণে খুলনাসহ দেশের ১২ জেলায় হাই-টেক পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেক থেকে প্রকল্পের বাজেট অনুমোদন করা হলেও কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে। বিভিন্ন জটিলতায় প্রকল্পের কাজ অনেক দেরিতে শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে বর্তমানে কোনো অর্থ ছাড় করছে না ভারত। এ কারণে পুরো প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ খুলনা নগরীর রূপসা লবণচরা এলাকায় দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির ৩ দশমিক ৫৯ একর জমিতে স্থাপনাটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে পরে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধির আবেদন করা হয়।
এদিকে নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে নাগরিক সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ ফ ম মহসীন জানান, প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ প্রকল্পের ধীরগতিতে এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর নির্মাণকাজে নিয়োজিত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে রেখে চলে যায়। এমতাবস্থায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
নাগরিক নেতারা বলেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রকল্পটি খুলনার মানুষের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান আহরণ এবং প্রয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ায় এ ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।
নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খুলনার তরুণ-তরুণীরা আইটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি বিনোদনের সুযোগ পাবে। এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ ছিল। কিন্তু স্থাপনা নির্মাণে ধীরগতির কারণে এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজেই জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রায় ছয় মাস পর ২০২২ সালের নভেম্বরে কাজ শুরু হয়। তিনতলা পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া অন্য কোনো কাজ শুরু হয়নি।
এ ব্যাপারে খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, হাই-টেক পার্কের নির্মাণকাজ বন্ধের পর পুনরায় চালুর ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রকল্প পরিচালক ফজলুল হক বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর নিরাপত্তা ইস্যুতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন ভারতে ফিরে গেছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।