খুলনার কেডিএ অ্যাভিনিউ ও খানজাহান আলী রোডের সংযোগস্থলে থাকা অনন্ত মল্লিকের পুকুরটি ভরাট করে বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। একই স্থানে রোতোবের পুকুর ভরাট করে বানানো হয়েছে আরেকটি হোটেল। পেছনে খানজাহান আলী রোডে একসময়ের তারের পুকুর এখন জাতিসংঘ শিশুপার্ক। কাছাকাছি স্থানে এভাবে আরও কয়েকটি পুকুর ভরাট হওয়ায় ওই এলাকার মানুষদের এখন বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশনের ড্রেনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এ ছাড়া আশপাশের এলাকা থেকে ওই এলাকাটি অপেক্ষাকৃত নিচু হওয়ায় বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। একইভাবে স্যার ইকবাল রোডে গোলকমনি পুকুর ভরাট করে সেখানে গোলকমনি পার্ক, ফেরিঘাট জলাশয় ভরাট করে ফেরিঘাট বাসস্ট্যান্ড, মরিয়মপাড়া পুকুর ভরাট করে কলেজিয়েট গার্লস স্কুল, শেখপাড়া মোড়ের পুকুর ভরাট করে সঙ্গীতা সিনেমা হল ছাড়াও কমপক্ষে ২৫টি পুকুর ভরাট করে শিববাড়ি থেকে রয়্যাল মোড় পর্যন্ত কেডিএ অ্যাভিনিউ রোড তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিন দশকে এভাবে খুলনা নগরীর শতাধিক পুকুর-দিঘি বিলুপ্ত হয়েছে। ‘বাংলাদেশের বিলুপ্ত দিঘি-পুষ্করিণী-জলাশয়’ গ্রন্থে গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী খুলনা নগরীতে ৮০টি পয়েন্টে শতাধিক বিলুপ্ত পুকুর-দিঘির কথা উল্লেখ করেছেন। এদিকে বর্তমানে নগরীতে কয়টি পুকুর অবশিষ্ট রয়েছে, তার সঠিক তালিকা নেই সিটি করপোরেশনের কাছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে সিটি করপোরেশন নগরীর মহেশ্বরপাশা, বাস্তুহারা, খালিশপুর, সোনাডাঙ্গা, বয়রা, বানরগাতি, গল্লামারী ও রূপসা এলাকায় ২৩টি পুকুর সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরেজমিনে গিয়ে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ১৭১টি পুকুরের তথ্য পেয়েছে। যার অধিকাংশই সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। অনেক স্থানে পুকুর ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও পুকুরের মধ্যেই ফেলা হয় ময়লা-আবর্জনা। পরিবেশবিদরা বলছেন, সচেতনতার অভাবে দিন দিন পুকুর-দিঘি সংকুচিত হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে জলাবদ্ধতা বাড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে।
অস্তিত্ব হারাচ্ছে পুকুর-দিঘি
জানা গেছে, ১০ বছর আগেও নগরীর শেখপাড়া নজরুল নগর স্কুলের পাশে দুটি পুকুর ছিল। এর মধ্যে একটি ভরাট করে লোহা-লক্কড়ের মার্কেট ও আরেকটি ভরাট করে সেমিপাকা ঘর তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব পুকুরের অংশীদার বেশি সেগুলোর অধিকাংশই অবহেলায় পড়ে আছে। ভরাট হওয়ার প্রবণতা ওই সব পুকুরে বেশি। শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো পুকুর নেই। কোনো কোনো পুকুর একসময় সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, এখন সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অযত্নে অনেক পুকুর কচুরিপানায় ভরে যাওয়ায় সেখানে মশার পরিমাণ বেড়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী এলাকায় ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের উপদ্রব বাড়ছে।
এদিকে নগরীর ৯ নং ওয়ার্ডের খালিশপুরে তিন একর জমিতে প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো দিঘি রয়েছে। হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এই দিঘিটি খনন করেন। শত বছর ধরে এলাকার মানুষজন গৃহস্থালি কাজে দিঘির পানি ব্যবহার করেন। মুজগুন্নি খানজাহান আলীর দিঘিটিও দখলদারত্ব ও সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এই দিঘিটি রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছেন বাসিন্দারা।
পুকুর-জলাশয় সংরক্ষণের উদ্যোগ
গত ১৮ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘খুলনা নগরীর পুকুর ও জলাশয়ের বর্তমান পরিস্থিতি: সংরক্ষণে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে নগরীর পুকুর-দিঘি রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। বেলার সমন্বয়ক মো. মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। এলাকাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পুকুরগুলো বাছাই করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা প্রতিনিধির মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।’ তিনি প্রয়োজনে সরকারিভাবে অধিগ্রহণের মাধ্যমে পুকুর-দিঘি সংরক্ষণের সুপারিশ করেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নগরীতে অনেক পুকুর-জলাশয় আছে, যেগুলো অবহেলিত ও উপেক্ষিত। জলাশয়গুলো সংরক্ষণে ব্যক্তি পর্যায়ে সবাইকে কাজ করতে হবে।