সেদিন ছিল ৫ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। তার পালিয়ে যাওয়ার খবরে বিকেলে অন্যান্য স্থানের মতো সাতক্ষীরার আশাশুনিতেও শুরু হয় আনন্দ মিছিল। মিছিলে যোগ দেন মেধাবী ছাত্র আমান উল্লাহসহ অনেকেই।
স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার দোসররা সেই আনন্দ মিছিলে গুলি ছুড়লে গুরুতর আহত হন আমান উল্লাহ। তার পেটে, বুকে ও ডান হাতের কাঁধে তিন জায়গায় তিনটি গুলি বিদ্ধ হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। লেখাপড়া শেষ করে আমান উল্লাহ কলেজশিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ অনেকটা ফিকে হতে চলেছে।
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর আমজাদ আলী সরদারের (৬৫) পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট আমান উল্লাহ (২৫)। তিনি খুলনার খালিশপুর হাজী মোহাম্মদ মুহসিন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। একই সঙ্গে তিনি একই জেলার কয়রা উপজেলার উত্তরচক বহুমুখী কামিল মাদ্রাসার কামিল শেষ বর্ষের ছাত্র।
আমান উল্লাহর মায়ের নাম আনোয়ারা খাতুন (৫০)। তিনি পেশায় একজন গৃহিণী। বড় বোন লিপিয়া খাতুন (৩৫)। বিবাহিতা এই বোন থাকেন তার শ্বশুরবাড়িতে। মেজো বোন আসমা খাতুন (৩২)। তার স্বামী মারা যাওয়ায় তিনি তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন। সেজো বোন সানজিদা খাতুন (৩০) ও তার পরের বোন নাসরিন নাহার (২৮)। তারা দুজনই থাকেন তাদের শ্বশুরবাড়িতে।
গুলিবিদ্ধ গুরুতর আহত আমান উল্লাহ জানান, গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর বিকেলে আনন্দ মিছিলে যান তিনিসহ অসংখ্য মানুষ। মিছিলটি প্রতাপনগর ইউনিয়নের তালতলা বাজার থেকে বের হয়ে ফুলতলা বাজার ও কল্যাণপুর বাজার হয়ে নাকনা গ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের বাড়ির সামনে দিয়ে যায়। এ সময়ে জাকির ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী শান্তিপূর্ণ আনন্দ মিছিলকে লক্ষ্য করে অনবরত গুলি ছোড়ে।
আমান উল্লাহর শরীরে মোট তিনটি গুলি লাগে। এর মধ্যে একটি তার পেটের ভেতরে ঢুকে পাঁচটি নাড়ি ছিদ্র করে ফেলে। আরেকটি গুলি তার বুকের ঠিক হার্টের দুই ইঞ্চি ওপর দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। আরেকটি গুলি তার ডান হাতের বাহুতে লাগে। এতে তিনি গুরুতর জখম হন। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসকরা অপারেশন করে তিনটি গুলি বের করেন। মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে তিনি আট দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হলে তাকে বেডে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি এক মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসা নেন।
চিকিৎসকরা বলেছেন, দুই মাস পর তার পেটে আরও একটি অপারেশন করতে হবে। এ নিয়ে আমান উল্লাহ খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। দিনমজুর বাবা অনেক কষ্ট করে তার গচ্ছিত সব টাকাপয়সা খরচ করে চিকিৎসা করিয়েছেন। আরেকটি অপারেশন করতে হলে সেই টাকা কোথায় পাবেন তিনি?
আমান উল্লাহ আরও বলেন, ‘লেখাপড়া শেষ করে কলেজশিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু সে স্বপ্ন নিরাশায় পরিণত হতে হচ্ছে। কারণ এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারিনি। এখনো ব্যথা আর যন্ত্রণা নিয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে। তার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
আমান উল্লাহর মা আনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘ছেলে আমার বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছে তখন সুস্থ ও সবল ছিল। হঠাৎ করেই বিকেলে খবর এল আমার ছেলে খুবই অসুস্থ। তার পেটে ও বুকে গুলি লেগেছে। খবর শুনেই ছুটে গেলাম তার কাছে। তাকে নিয়ে গেলাম সাতক্ষীরায়। যেভাবে সে রক্তাক্ত ও জখম হয়েছে। তার তো বাঁচার কথা না। মহান আল্লাহপাকই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ছেলেটার লেখাপড়া শেখানো হচ্ছে। ওর বাবা দিনমজুরের কাজ করে আমাদের সংসার চালায়। আর্থিক অবস্থাও ভালো না। তার ওপর ছেলের চিকিৎসায় যা কিছু ছিল সবই শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। ওকে ভালো-মন্দ খেতেও দিতে পারি না।’
আমান উল্লাহর বাবা দিনমজুর আমজাদ আলী সরদার বলেন, পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট আদরের একমাত্র ছেলে আমার আমান উল্লাহ। তাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। ছেলে আমার লেখাপড়া শিখে ভালো একটা চাকরি করবে এবং সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু কী যে হয়ে গেল। ছেলে আমার যন্ত্রণার ক্ষত নিয়ে এখন চলাফেরা করছে।’
অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘ওর চিকিৎসার পেছনে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি নিঃস্ব। আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই। সরকারি-বেসরকারি তেমন কোনো অনুদানও পাইনি। এখন কীভাবে চলব তাই ভাবছি।’ সূত্র: বাসস