আধুনিক যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক ও জনবলসংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এটি তৈরি করা হয়। পরে রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এর পরও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির সেবার মান সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার অন্যান্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মতোই এখানে পুরুষ থেকে নারী রোগীর সংখ্যা বেশি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন অনেক রোগী। অপর দিকে জনবলসংকটে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। রোগী অনুপাতে চিকিৎসক স্বল্পতা, ওষুধসংকট ও খাবার সরবরাহে তেমন সন্তোষজনক সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। এ ছাড়া সুইপারসংকটের কারণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। রোগীদের অভিযোগ রোগ নির্ণয়ের আধুনিক যন্ত্রপাতি তেমন না থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরের ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে তাদের। তবে অনেকের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় তারা চিকিৎসা নিতে পারছেন না।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খাবারের মান তেমন ভালো না। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধও তেমনভাবে মেলে না। এখানে ডিজিটাল এক্স-রে, ইসিজি, অপারেশন থিয়েটারসহ সব ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও টেকনিশিয়ান এবং দক্ষ জনবলের অভাবে এগুলো নষ্ট পড়ে আছে। তাই সাধারণ কিছু চেকআপও বাইরে থেকে করিয়ে নিয়ে আসতে হয়। এ ছাড়া জরুরি বিভাগ, ইনডোর, আউটডোর ও অ্যাম্বুলেন্স সেবায় নেই পর্যাপ্ত লোকবল। একধরনের নাজুক অবস্থা এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। হাসপাতালে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদের সংখ্যা মোট ১১০টি। এর মধ্যে শূন্য পদের সংখ্যা ৩৪টি।
চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের আবদুল কাদের (৫০) বলেন, ‘কিছুদিন ধরেই আমার জ্বর, পেটব্যথা ও বুকে ব্যথা। এখানে আসার পর ডাক্তার কয়েকটি টেস্ট দিল। সেই টেস্টের প্রায় সবই বাইরে থেকে করিয়ে আনতে হয়েছে। যদি বাইরে থেকেই টেস্ট করতে হয়, তাহলে এখানে এসে কী লাভ!’
উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের নীলিমা আক্তার (৩৮) বলেন, ‘আমার এক বছরের মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। বেড না পাওয়ায় বারান্দার মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। ঠাণ্ডার কারণে চিকিৎসা নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ডাক্তার অনেক ওষুধ লিখে দিয়েছেন। সেই ওষুধগুলো এখানে না পেয়ে বেশি দামে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।’
ছেলের ঠাণ্ডাজনিত রোগের চিকিৎসা নিতে আসা মদাতী ইউনিয়নের আফজাল হোসেন (৪৪) বলেন, ‘হাসপাতালে আমি দুই দিন থেকে রয়েছি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের খাবারের মান বেশি সুবিধাজনক না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধও এখানে তেমন পাওয়া যায় না। বাকি ওষুধগুলো বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে মেয়েকে খাওয়াতে হচ্ছে।’
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তৌহিদ হাসান বলেন, ‘চিকিৎসকসহ জনবলসংকট চলছে আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিয়মিত কার্যক্রমে। হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগী অনুপাতে চিকিৎসক ও ওষুধসংকট রয়েছে এখানে। সেই সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ল্যাব টেকনিশিয়ান নেই। বর্তমানে এখানকার খাবারের মান যথেষ্ট ভালো করার চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্যতম সমস্যা হলো সুইপারসংকট। এ কারণে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে একটু সমস্যা হচ্ছে। সমস্যাগুলো সমাধান হলে স্বাস্থ্য সেবার মান আরও ভালো হবে।’
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলী রাজিব মো. নাসের বলেন, ‘লোকবলসংকট থাকার পরও আন্তরিকতার সঙ্গে হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। ভালো সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা রয়েছে। জনবলের চাহিদাসহ আরও বেশ কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি, সমস্যাগুলো খুব দ্রুত সমাধান হবে।’