নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই হবিগঞ্জের ১১৯টি ইটভাটা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে স্থানীয় পরিবেশ এবং মানুষের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একদিকে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া অন্যদিকে শ্বাসকষ্টসহ বায়ুবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ নানামুখী সংকটে পড়ছেন। এত বিপর্যয়ের পরও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পরিবেশকর্মীরা। তারা জানিয়েছেন, ভাটার মালিকরা এতটাই প্রভাবশালী যে, কেউ প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়। এতে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। প্রশাসনের উচিত- যাদের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, অন্তত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এই যেমন হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়ক। মাত্র পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে অন্তত ২০টি ইটভাটা। দূর থেকেই চোখে পড়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী, আর চারপাশে ধুলোবালির ঝাপটা। এতে একদিকে যান চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে আশপাশের জনপদে নেমে এসেছে অদৃশ্য বিপদ।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে ইটভাটা রয়েছে ১১৯টি। এর মধ্যে ২৪টি ভাটার পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। আবার যাদের ছাড়পত্র আছে, তারাও পরিবেশ আইন মানছে না। নিয়ম না মেনে পরিবেশ ধ্বংস করে চলছে ভাটার কার্যক্রম।
এই ভাটাগুলোর কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় গাছপালা ও কৃষিজমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, আম-কাঁঠালসহ মৌসুমি ফলের গাছে এখন আর আগের মতো ফল আসে না। পাতাগুলো বিবর্ণ, ধুলার মোটা আস্তরণে ঢাকা। জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনও পড়েছে হুমকির মুখে।
শুধু ধোঁয়া-ধুলো নয়, ইটভাটায় মাটি সরবরাহ করা হয় আশপাশের উর্বর ফসলি জমি থেকে। ভাটার মালিকদের প্রলোভনে পড়ে অনেক কৃষক তাদের জমির উপরিভাগ (টপসয়েল) কেটে মাটি বিক্রি করছেন। এতে জমির গঠন ও উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
শুধু শহর এলাকায় নয়, ভাটি এলাকার গ্রামীণ পরিবেশও ইটভাটার কারণে নষ্ট হচ্ছে। ভাটাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বানিয়াচংয়ের রত্না বাজারের আবিদ আতিয়া ব্রিকস, পুকড়া গ্রামের কে এম ব্রিকস, হাওরবেষ্টিত উপজেলা আজমিরীগঞ্জের কাকাইলছেও গ্রামের ভূইয়া ব্রাদার্স ব্রিকস, লাখাই উপজেলার স্বজন গ্রামের লাখাই ব্রিকস, একই উপজেলার মোড়াকরি ইউনিয়নের সিএমসি ব্রিকস ও তিতাস ব্রিকস।
সদর উপজেলার সুখর এলাকার বাসিন্দা রমিজ মিয়া বলেন, ‘ইটভাটার কথা বলে লাভ নেই। ভাটার ধোঁয়ার কারণে অনেকে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি ও চর্মরোগে ভুগছেন। একটু বাতাস হলেই আমাদের এলাকার রাস্তা-ঘাট দেখা যায় না- সব ধুলাবালিতে অন্ধকার হয়ে যায়। বাড়ি-ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করেও রক্ষা পাওয়া যায় না।’
মিরপুরের কৃষক মঈন উদ্দিন বলেন, ‘আগে আমাদের জমিতে বছরে দুই-তিনবার ফসল হতো। এখন মাটির রংই বদলে গেছে। ধান ভালো হয় না, শাকসবজিও মরে যায়। ধোঁয়ার জন্য গাছপালা শুকিয়ে যাচ্ছে। আগের মতো ফল-ফুল আসে না। কিছু গাছে গুটি এলেও তা পড়ে যায়।’
রফিক মিয়া নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘এলাকার এমন কোনো জমি নেই যেখান থেকে মাটি কাটা হয়নি। ইটভাটার মালিকরা জমির ওপরের উর্বর মাটি কেটে নিয়ে গেছে। না বুঝে কৃষকরা সামান্য টাকায় এগুলো বিক্রি করেছেন। এখন সবাই মাথায় হাত দিয়ে কাঁদছেন। আগের তুলনায় ফসল অর্ধেকও হয় না।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘অধিকাংশ ইটভাটাই পরিবেশ বিধি লঙ্ঘন করছে। ধুলাবালি ও ধোঁয়ার কারণে মানুষের জীবন আজ হুমকির মুখে। অথচ ভাটার মালিকদের প্রভাব এত বেশি যে, কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। কেউ প্রতিবাদ করলেই তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন যদি সঠিক নজরদারি রাখত, পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। অন্তত যাদের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, তাদের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু সেটাও দেখা যাচ্ছে না।’
এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. ফরিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে অবৈধ চারটি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়েছি। যেসব ভাটা পরিবেশনীতি লঙ্ঘন করছে, তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চলবে। আমি পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’