বৃক্ষেরও কি হাসপাতাল হয়? হয় যদি সেই সমাজে গাছকে শুধু অক্সিজেন সরবরাহকারী সত্তা নয় বরং স্মৃতির অংশ ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনই একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনায়। যার নাম ‘ট্রি-হসপিটাল’।
বরগুনার ইকো ট্যুরিজম উদ্যোগ সুরঞ্জনা ইকো টুরিজম অ্যান্ড রিসোর্টে অবস্থিত সেবামূলক এই বৃক্ষ-সংরক্ষণ কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছে ভাগ্য বিড়ম্বিত এবং স্মৃতিবিজড়িত বহু পুরোনো গাছ।
বরগুনার চিকিৎসক ডা. মনিজা জানান, শহরের জমি বিক্রির পর তার বাবা-মায়ের হাতে লাগানো বহু পুরোনো গাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এই গাছগুলো ছিল তাদের পরিবারের ইতিহাসের নিরব সাক্ষী। ঠিক তখনই এগিয়ে আসে সুরঞ্জনা। তারা বিশেষ কৌশলে সেসব বৃক্ষ তুলে এনে সংরক্ষণ করে ট্রি-হসপিটালে। এখন তিনি এবং তার পরিবার সেই গাছগুলোর কাছে ফিরে যান ঠিক যেন পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে।
ছবি: খবরের কাগজ
একই অভিজ্ঞতা সাবেক জেলা ও দায়রা জজ রোখসানা বেনজুরও। তিনি বলেন, স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত গাছগুলো হারিয়ে ফেলাটা একধরনের মানসিক কষ্ট। সুরঞ্জনার উদ্যোগ আমাদের সেই কষ্ট অনেকটাই লাঘব করেছে। এখানে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক গাছ স্থান পেয়েছে যাদের কেউ গৃহস্থালির কারণে কাটা পড়ার আশঙ্কায় ছিল, কেউ আবার নদীভাঙনের কবলে পড়েছিল।
সুরঞ্জনার উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজ বলেন, নগর উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার কিংবা বাড়ি নির্মাণের জন্য যে গাছগুলো কাটা পড়ে তাদের একটি বিকল্প ঠিকানা দরকার। আমাদের ট্রি-হসপিটাল সেই ঠিকানাই দিয়েছে। যেভাবে আমরা কন্যা সন্তানকে ১৮ বছর না হলে বিয়ে দিই না তেমনি গাছের ক্ষেত্রেও ১৬ বা ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে কাটা উচিত নয়। এই বিষয়ে একটি জাতীয় আইন হওয়া প্রয়োজন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর কবীর বলেন, বহু দেশে শহরের পুরোনো গাছ সংরক্ষণের উদ্যোগ দেখা যায়। সুরঞ্জনার ট্রি-হসপিটাল সেই দৃষ্টান্তকেই বরগুনার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বাস্তব করে তুলেছে। এটি অন্য জেলাগুলোর জন্যও অনুসরণযোগ্য মডেল।
বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস উদ্যোগটি ঘুরে দেখে বলেন, সুরঞ্জনা শুধু গাছ নয়, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কাজ করছে। এখানে তাল, খেজুর, ডেউয়া, কাঠবাদাম, গাব, কাউফলসহ বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় গাছের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এই গাছগুলো শুধু পরিবেশ নয়, পাখ-পাখালির জন্যও একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠছে।
মহিউদ্দিন অপু/