কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের একটি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে আল শাহারিয়া। কয়েক দিন আগে বলীখেলা দেখতে যাওয়ার পথে সে অপহরণের শিকার হয়। দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয়। এরপর তার খোঁজ মিলছিল না। গত শুক্রবার রাতে তাকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। বাহারছড়ার মারিচবনিয়া উপকূল দিয়ে সাগরপথে তাকে ট্রলারে করে মালয়েশিয়া পাচার করা হচ্ছিল। ওই ট্রলারে অভিযান চালিয়ে আল শাহারিয়াসহ ৫০ জনকে উদ্ধার করে কোস্টকার্ড। এ সময় আটক করা হয় মানব পাচারে জড়িত ৯ জনকে।
শাহারিয়ার দাবি, ফারুক নামে এক ব্যক্তি তাকে মানবপাচারকারী দালাল চক্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।
অভিযানে উদ্ধার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বিদেশে উন্নত জীবন ও উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র টেকনাফে নিয়ে আসে। পরে তাদের গোপন আস্তানায় আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে তাদের সাগরপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের পরিকল্পনা করে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেককে অপহরণ করে এনেও পাচারের চেষ্টা ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, টেকনাফের বিভিন্ন উপকূলীয় নৌঘাট ও সংলগ্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারকারীদের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকা থেকে নৌপথে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। চিহ্নিত ঘাটগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া, শীলখালী, বড় ডেইল, কচ্ছপিয়া, মাথাভাঙ্গা ও মারিচবনিয়া নৌঘাট।
গতকাল শনিবার কেরুনতলি টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীটির স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুত্তাকীন সিদ্দিকী বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের প্রস্তুতি চলছে—এমন গোপন তথ্যে গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি সন্দেহভাজন ট্রলারকে থামার সংকেত দিলে সেটি পালানোর চেষ্টা করে। পরে ধাওয়া করে টেকনাফের বাহারছড়াসংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় এটিকে থামানো হয়। এ সময় ৫০ ভুক্তভোগীকে উদ্ধার ও ৯ পাচারকারীকে আটক করা হয়।
মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক ট্রলারের স্টাফরা অবশ্য নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। বলেছেন, মাছ ধরার কথা বলে তাদের সমুদ্রে নামানো হয়। পরে ট্রলারমালিক তাদের মানুষ টানতে বাধ্য করেন। স্টাফদের একজন সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, তাকে মাছ ধরতে যাওয়ার কথা বলে ট্রলারে আনা হয়েছিল। তারা দুই দিন সাগরে মাছ শিকার করেন। পরে হঠাৎ জাল তুলে ট্রলারটি টেকনাফের বাহারছড়া মরিশবুনিয়াসংলগ্ন সাগরে নোঙর করা হয়।
তিনি বলেন, ‘ট্রলারে মোট ১৪ জন মাঝি-মাল্লা ছিলেন। একপর্যায়ে একটি ছোট মাছ ধরার ডিঙি নৌকায় করে কয়েকজন লোককে এনে ট্রলারে তোলা হয়। বিষয়টি মাঝির কাছে জানতে চাইলে তিনি তখন জানান, এটি মালিকের নির্দেশে করা হয়েছে। পরে ওই লোকজন রাতেই ট্রলারে অবস্থান নেন।’
সিরাজুল জানান, পরে কোস্টগার্ড ট্রলারটি ঘিরে ফেলে। এ সময় মাঝি শাহীনসহ কয়েকজন সাগরে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান। তিনি দাবি করেন, ট্রলারের মালিক জসিম এবং মাঝি শাহীন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে এসব অপকর্ম করতেন। তাদের মাছ ধরার কাজের কথা বলে ট্রলারে আনা হলেও প্রকৃতপক্ষে অন্য উদ্দেশ্যে ট্রলারটি ব্যবহার করা হচ্ছিল।
টেকনাফের নোয়াখালীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘নোয়াখালীপাড়া থেকে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ দূরত্বের সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা ডাকাতি, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত পাহাড়ে পালিয়ে যায়। এলাকাবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে নোয়াখালীপাড়ায় একটি পুলিশ চৌকি স্থাপন করা জরুরি।’
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক আবু সাঈদ জানান, মানবপাচার, অপহরণ ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় টহল কার্যক্রম এবং চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ১০০ সদস্যের একটি গ্রাম প্রতিরোধ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে।