ইছামতী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী মানিকগঞ্জের ঘিওর বাজার ও হাট আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব, ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা এবং ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে প্রতিদিন হাজারো ব্যবসায়ী ও ক্রেতাকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অথচ এই বাজারে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার লেনদেন হয়। বাজারে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ১২০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পুরো বাজার ও হাট প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বাজারের ধানহাট, কাঠপট্টি, মাছবাজার, গুড়পট্টি ও সবজিবাজারের বিভিন্ন অংশ হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। জলাবদ্ধতার পানি শুকিয়ে গেলে সৃষ্টি হয় তীব্র দুর্গন্ধ। নোংরা পরিবেশের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রতি বুধবার বসা ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন। একসময় এই হাট ছিল আশপাশের অঞ্চলের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু অবকাঠামোগত সংকটের কারণে এখন অনেক ক্রেতাই বাজারমুখী হচ্ছেন না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
মাছবাজারের ব্যবসায়ী প্রকাশ রাজবংশী জানান, একটু বৃষ্টি হলেই মাছবাজারে পানি জমে যায়। ড্রেনে ময়লা জমে যায়। আর এসব কাদা-পানি মাড়িয়ে ক্রেতারা আসতে চান না। এতে আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না।
কাঠপট্টির ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, এ বাজারের কোনো উন্নতি নেই। বৃষ্টির দিনে আমাদের এই পট্টি দিয়ে হাঁটাচলা করাই কষ্ট, সেখানে মালামাল নেওয়া তো আরও কষ্টের ব্যাপার।
মেসার্স অনন্যা ট্রেডার্সের মো. রফিকুল বলেন, ‘আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কাঠপট্টিতে। আমি স্যানিটারি সামগ্রী বিক্রি করি। এই পট্টিতে প্রায় ৩০-৩৫ জন কাঠ ব্যবসায়ী আছেন। বৃষ্টির দিনে তাদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয়। বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে আসে। বৃষ্টির পর এমন পরিবেশ হয় যে, তখন আর ক্রেতারা আসতে চায় না।’
আরেক ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা হাটে ইজারা দিই। কিন্তু বাজারের অবস্থা দেখলে মনে হয় কোনো কর্তৃপক্ষের নজর নেই। বৃষ্টির সময় হাটে ব্যবসা করার কোনো পরিবেশ থাকে না।’
সবজিবাজারের ব্যবসায়ী আলমাস ইসলাম বলেন, ‘নোংরা পানি জমে থাকার কারণে বাজারে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে ক্রেতারা দ্রুত বাজার ছেড়ে চলে যান। ব্যবসার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে বাজারে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। হাঁটুপানি মাড়িয়ে বাজার করতে হয়। পরিবার নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। এই বাজারের পরিবেশ ভালো করা প্রয়োজন।’
রেহানা বেগম নামে এক নারী বলেন, ‘ময়লা পানির গন্ধে বাজারে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। আমার স্বামী বিদেশ থাকেন। আমাকেই প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করতে হয়। বিশেষ করে আমাদের মতো নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি খুবই অস্বস্তিকর। এত বড় একটি বাজারের এই অবস্থা হওয়া দুঃখজনক।’
ঘিওর বাজার ব্যবসায়ী ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ লতা বলেন, ‘ঘিওর বাজার জেলার অন্যতম বড় বাজার। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কেনাবেচা হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেই তুলনায় কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। জলাবদ্ধতা ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বুধবার হাটে হাজার হাজার মানুষ আসে। অথচ মৌলিক অবকাঠামোর অভাবে সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত বাজারের সমস্যা সমাধান করা হোক।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে বেপারীপাড়া এলাকায় প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সরু ড্রেন নির্মাণ করা হয়। তবে ড্রেনটির কোনো ঢাকনা নেই। ফলে এটি যেমন পানি নিষ্কাশনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি, তেমনি পথচারীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারে অনেকেই ড্রেনে পড়ে আহত হন। জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তারও বাড়ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাশিতা-তুল ইসলাম বলেন, ‘ঘিওর বাজারের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। বাজারের ড্রেনেজ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। গরু হাট থেকে মাছবাজার পর্যন্ত আরসিসি সড়ক করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও কাজ করা হবে।’