দারিদ্র্যপীড়িত এক পরিবারের সন্তান রাজিউল ইসলাম। কৈশোরেই সংসারের হাল ধরেন বাবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এইচএসসি পাসের পর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পে উপজেলা পরিষদে টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও জীবিকার চাকা থামিয়ে দেননি তিনি, শুরু হয় নতুন কর্মসংস্থানের খোঁজ।
২০২১ সালের ৮ জুন ঘটে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। আম পাড়ার সময় গাছ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন রাজিউল। প্রাণে বেঁচে গেলেও কোমর থেকে নিচের অংশ স্থায়ীভাবে অচল হয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, হাঁটা আর সম্ভব নয়। কিন্তু ভাগ্যের এই কঠিন আঘাতে রাজিউল হার মানেননি। বৃদ্ধ বাবা-মা ও সংসারের দায়িত্ব তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। এক বছরের চিকিৎসা শেষে নতুনভাবে বাঁচার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০২২ সালে নবাবগঞ্জ উপজেলা গেট সংলগ্ন প্রতিষ্ঠা করেন একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। উপজেলা পরিষদ ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা হিসেবেই তিনি ব্যবসা চালাচ্ছেন। হুইল চেয়ারে বসেই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেন। পাশাপাশি কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার সার্ভিসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা নিজ হাতে দেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে চার-পাঁচজন কর্মচারী কাজ করছেন এবং নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। রাজিউলের সাফল্য দেখে অনেকেই অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।
কর্মচারী আজিজুল হক বলেন, ‘আমরা সুস্থ হয়েও অনেক সময় কাজ করি না। অথচ রাজিউল ভাই প্রতিবন্ধী হয়েও আমাদের মতো পাঁচজনকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।’
প্রতিবন্ধী শফিউল আলম বলেন, ‘প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোথাও কাজ পাওয়া সম্ভব হয়নি। রাজিউল ভাইয়ের সাফল্য আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এখন আমি তার প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি এবং কাজ শিখছি।’
শিক্ষার্থী ঊর্মিলা বলেন, ‘প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি (রাজিউল ইসলাম) নিজেই আমাদের কম্পিউটার শেখান। তার আন্তরিকতা ও পরিশ্রমে আমি মুগ্ধ। এমন একজন মানুষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পেরে আমি গর্বিত।’
নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে রাজিউল ইসলাম বলেন, ‘আমার মতো অনেক প্রতিবন্ধী আছেন, যারা অবহেলিত। তাদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ খুব কম। আমার লক্ষ্য, প্রতিবন্ধীদের অধিকার, সম্মান ও কর্মে অনুপ্রেরণা দেওয়া। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়।’
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শুভ্র প্রকাশ চক্রবর্তী বলেন, ‘দুর্ঘটনায় কোমরের নিচের অংশ অচল হলেও রাজিউল থেমে থাকেননি। দৃঢ় মনোবল ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি আজ সফল উদ্যোক্তা। সমাজসেবা অফিস থেকে তাকে নানা সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’