বছরের পর বছর অব্যাহত নদীভাঙনের কারণে পদ্মা ও মহানন্দা তীরের মানুষরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষিজমি ছাড়াও শেষ সম্বল ভিটেমাটি হারিয়ে তারা বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। বারবার ভাঙনের কবলে পড়ে নিজেদের বেড়ে ওঠা জায়গা ছেড়ে তাদের অন্য কোথাও চলে যেতে হচ্ছে।
একেক জন একেক জায়গায় ঘর তোলায় তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে পরিবারের বন্ধন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বাপ-দাদার সময় থেকে তারা ভাঙনের চিত্র দেখে আসছেন। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে কাউকে ভাবতে দেখা যায় না। প্রতিবছর অস্থায়ী বাঁধ মেরামতে যে অর্থ খরচ হয়, তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। তারা এর স্থায়ী সমাধান চেয়েছেন। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ‘পদ্মা নদীর তীররক্ষা’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি হলে নদীভাঙনের সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সদরের নারায়ণপুর-আলাতুলি ইউনিয়ন এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর-পাঁকা ইউনিয়নের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সদরের দেবিনগর, শাজাহানপুর, চরবাগডাঙ্গা ও আলাতুলি ইউনিয়নের কিছু অংশে ভাঙন দেখা দেয়। নদীর পানি বাড়া-কমার সময় নদীভাঙন তীব্র হয়। এতে বর্ষা ও শুকনো মৌসুমে ওই এলাকার মানুষরা আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করেন। তাদের রাত কাটে অনিশ্চয়তায়।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙন শুরু হয়। এতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় ৫০০ পরিবার ভাঙনের মুখে তাদের ঘর-বাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বরেন্দ্র অঞ্চল অথবা রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে বসতঘর তুলছেন।
পদ্মাতীরবর্তী বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই নদীর ভাঙা-গড়ার খেলা দেখছি। প্রতিবছর ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে গেছে বাড়ির দরজায়। অস্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে প্রতিবছর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা গচ্চা না দিয়ে স্থায়ীভাবে বাঁধ দিলে আমরা রেহাই পাব।’
নারায়ণপুরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সামাদ কালু বলেন, ‘পদ্মার ভাঙনে আমি নিজে পাঁচবার বাড়ি ভেঙেছি। নদীভাঙনের কারণে এই বয়সেও (৭৫ বছর) বারবার বাড়ি ভেঙে অন্য জায়গা সরিয়ে নিতে হয়েছে। ভাঙনে আমি বাড়িঘর সরিয়েছি, আমার বাবা-দাদারাও নদীভাঙনে তাদের ভিটামাটি সরিয়েছেন।’
নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছরের মধ্যে নদীভাঙনে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উপ-সাইক্লোন কেন্দ্র বিলীন হয়ে গেছে। এবার সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের কিছু অংশ ভেঙেছে। কিছু ভাঙনের মুখে সরানো হয়েছে। তীব্র ভাঙনে ইউপি ভবনের জায়গাটিও আর থাকল না।’
এক সময় যেখানে পরিবারের সদস্যরা বসে গল্প করতেন, জীবনের সবমুহূর্ত ভাই-বোন, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতেন, সেই স্মৃতিও মুছে যাচ্ছে পদ্মাপাড়ের বাসিন্দাদের। ভাঙনে দিশেহারা হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সবাই বিভিন্ন দিকে ঘর তুলছেন। এতে করে স্বজনদের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে।
সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের ভাঙনে ভিটামাটিসহ সব নদীতে চলে গেছে। সেখান থেকে সরে এসে বাধ্য হয়ে অন্যের জায়গায় ঘর তুলছি। আমার ভাই এখনো ওই জায়গায় রয়ে গেছেন। এই কাজ শুধু আমি না, আমাদের প্রতিবেশীরাও করতে বাধ্য হয়েছে। সবাই বিভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। যে যার মতো করে অন্যের জায়গায় ঘর তুলে বাস করছে।’
একই উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের মুনিজা খাতুন বলেন, ‘গত এক মাস আগেই আমার শ্বশুরবাড়ির ভিটেমাটি নদীতে চলে গেছে। আমি সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি মানিকচরে উঠেছি। এ রকম প্রতিবছরই করতে হয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ এখন ভাঙনের মুখে। জরুরি ভিত্তিতে পোলাডাঙ্গা বিওপি ও মনোহরপুর এলাকায় জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ চলছে।’
তিনি বলেন, ‘সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা নদীর তীররক্ষা নামে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমে এ প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৭৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। বর্তমানে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাঁধ নির্মাণ করা হবে।’