পটপরিবর্তনের পর ইউনিয়ন পরিষদগুলো অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিহীন। প্রশাসনেও নানা রদবদলে সরকারি সেবা প্রাপ্তি নিয়ে প্রান্তিক মানুষজনের মধ্যে রয়েছে টানাপোড়েন। এ অবস্থায় সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সিলেট জেলার সীমান্ত উপজেলা কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া আক্তার প্রান্তজনের পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রতি মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষে দুদিন সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রান্তিক এলাকায় অবস্থান করে সরকারি সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
চলতি মাসের সেপ্টেম্বরের প্রথম পক্ষে মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিনভর কানাইঘাটের ৭নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নে অবস্থান করে এ উদ্যোগের সূচনা করেন ইউএনও তানিয়া আক্তার।
বুধবার তিনি খবরের কাগজকে জানান, প্রতি মাসের দুই দিন তিনি পুরো অফিসটাইম প্রান্তিক এলাকায় কাটাবেন। সেখানকার মানুষজনের কাছ থেকে সরাসরি তাদের কথা শুনে সরকারি সেবা পাওয়ার বিষয়টি তাৎক্ষণিক নিশ্চিত করবেন।
সিলেট জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও সীমান্ত প্রান্তিক এলাকা হিসেবে কানাইঘাটে এ উদ্যোগ তিনি যতদিন এখানে থাকবেন, ততদিন করার চেষ্টা করবেন বলে জানান।
কানাইঘাট বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একটি উপজেলা। ভৌগোলিক কারণে সেখানকার একেকটি এলাকা একেক রকম। বেশিরভাগ প্রত্যন্ত ও সরাসরি যোগাযোগ বিড়ম্বিত। উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভাসহ হাট-বাজারে প্রান্তিক মানুষজনের সঙ্গে সরাসরি সভা-সমাবেশ ও সাক্ষাতের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার প্রয়াসে বাণীগ্রাম ইউনিয়ন থেকে এ কার্যক্রমের সূচনা করা হলো।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ইউএনও প্রশাসনিক টিম নিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাণীগ্রাম অবস্থান করেন। এ সময় বাণীগ্রামের মানিকগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ সবস্তরের জনসাধারণকে নিয়ে অভিভাবক সমাবেশ করেন।
দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান লোকমান উদ্দিনের সভাপতিত্বে অভিভাবক সমাবেশে প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাল্যবিয়ে রোধ, ইভটিজিং বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা, মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুসনদ সম্পর্কে জানানো হয়। পাশাপাশি সাইবার বুলিং, মোবাইল আসক্তি, স্বাস্থ্য সচেতনতার ওপর শিক্ষার্থীসহ সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
এলাকাবাসী জানান, সরকারি সেবা জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াসহ জনসচেতনতায় উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী প্রধানকে এভাবে কাছে পাওয়া এবারই প্রথম। মঙ্গলবার দিনভর এলাকাবাসী ইউএনওকে কাছে পেয়ে তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের বিষয়টি সরাসরি জানাতে পেরে অনেকেই খুশি।
শুরুতে উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গনে মাঠ পর্যায়ের অভিভাবক সমাবেশ হয়। এরপর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রদত্ত সেবা তাৎক্ষণিক প্রদানের জন্য মাঠপর্যায়ের কাজ সরাসরি তদারক করেন ইউএনও তানিয়া আক্তার।
অভিভাবক সমাবেশে কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আউয়াল, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ রায়, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী পনিরুজ্জামান, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার শাখাওয়াত হোসেন, মানিকগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক-সহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
কানাইঘাট উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য পর্যায়ক্রমে উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন, পৌরসভাসহ হাট-বাজারে এসব বিষয়ের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হবে জানিয়ে সমাবেশে ইউএনও প্রান্তজন উদ্যোগ সম্পর্কে এলাকাবাসীকে বলেন, সরকারের সবধরণের সেবা উপজেলা প্রশাসনের সব দপ্তরের কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের তাদের কাজ নিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসের দুই দিন জনসাধারণকে তাদের কাছাকাছি গিয়ে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি মৌসুম অনুযায়ী সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন ও প্রচারণার বিষয়টি জানানো হবে।
ইউএনও বৃক্ষরোপনে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে গাছের চারা রোপন করেন। তাছাড়া বর্ষার পর সুরমা নদীর ভাঙন পরিস্থিতি জানতে এলাকাবাসীকে নিয়ে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন।
ইউএনও তানিয়া আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্ষার পর সুরমা নদীর ভাঙন শুষ্ককালে নীরব দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়। এ বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জানানো হবে।’
অমিয়/