তিন রোহিঙ্গাকে জন্মনিবন্ধন দেওয়ার ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক উদ্যোক্তাকে বরখাস্ত করা হলেও চেয়ারম্যান ও ইউপি সচিব রয়েছেন বহাল তবিয়তে। তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়রা বলছেন, একটি ইউনিয়ন পরিষদে একাধিক ব্যক্তি দায়িত্বে থাকার পরও রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন দেওয়ার মতো এত বড় ঘটনা কীভাবে ঘটল। এটি দায়িত্বের চরম অবহেলা। ঘটনাটি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১০নং বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের। তৎকালীন ইউএনও জিল্লুর রহমানের নির্দেশে উদ্যোক্তা রাসেল মিয়াকে গত ১৭ আগস্ট সাময়িক বরখাস্তের নোটিশ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধনের আবেদনকারীর নাম রাহমত উল্লাহ। বাবার নাম মৃত শাহা আলম, মাতা সেকুমন নাহার। জন্ম তারিখ ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৬। জন্মনিবন্ধন পেতে তিনি গত ৩ আগস্ট আবেদন করেন। একই তারিখে তা গ্রহণও করেন। সেখানে জন্মস্থানের ঠিকানা দেওয়া হয়- চিতলিয়া বাজার, ৬নং ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌর সভা, কক্সবাজার সদর।
আরেক আবেদনকারীর নাম সৈয়দ আমিন। বাবা- শামশুল আলম, মাতা- অলমরজান। জন্ম তারিখ ৮ জুলাই ১৯৯৮। আবেদন করেছেন ৭ জুলাই, গ্রহণ করেছেন একই দিনে। জন্মস্থানের ঠিকানা- যাদবপুর, ওয়ার্ড নম্বর ৩, কক্সবাজার পৌর সভা। এ ছাড়া তৃতীয় আবেদনকারীর নাম বোরহান উদ্দিন। বাবা- মোহাম্মদ নূর উদ্দীন, মায়ের নাম সৈয়দা তানবীন সোলতানা ফ্লোরা। জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ২০০৪। জন্মনিবন্ধন পেতে আবেদন করেছেন ৬ জুলাই ২০২৫, একই তারিখে তা গ্রহণ করেছেন। জন্মনিবন্ধনে স্থায়ী ঠিকানা দেয়া আছে- চিতলিয়া বাজার, ৬নং ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌর সভা। ওই তিনজন জন্মস্থানের ঘরে কক্সবাজার লিখলেও বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ১০নং বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ উল্লেখ করেছেন। তাদের ভোটার আইডি কার্ডের তথ্যও খবরের কাগজের কাছে পৌঁছেছে।
বরখাস্ত হওয়া ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা রাসেল মিয়া বলেন, ‘আমাকে হঠাৎ বরখাস্ত করা হয়েছে। শোকজ করলেও উত্তর দিতে পারতাম। দীর্ঘ ১৪-১৫ বছর ধরে এখানে কাজ করি। তখন সেখানে তিনজন কাজ করেছি। কাউকে বাদ না দিয়ে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইউএনও তিনজনকেই বরখাস্ত করতে বলেছিলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান শুধু আমাকে বরখাস্ত করেছেন।’
কথা হয় বালুয়া মাসুমপুর ইউনিয়নের উচা বালুয়া এলাকার বাসিন্দা রহিম মিয়ার সঙ্গে। ওই তিনজনকে চেনেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এই তিন নামের কেউ থাকেন না। আমি কখনো এমন কাউকে দেখিনি। চিনিও না। তারা মনে হয় টাকা দিয়ে জন্মনিবন্ধন বানিয়েছে।’
১০নং বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য শওকত আলী ওই তিন রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বলেন, ‘তাদের বাবার নাম মিললে ছেলের নাম মেলে না। ছেলের নাম মিললে বাবার নাম মেলে না। আমি তাদের কাউকে চিনি না। তাদের জন্য সুপারিশও করিনি।’
ওই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সচিব মতিনুজ্জামান বলেন, ‘আমার কাছে পাসওয়ার্ড ছিল না। পাসওয়ার্ড থাকে হিসাব সহকারীর কাছে। এটার দায় উদ্যোক্তার। আমি যখন ছিলাম তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। আমি জুন-জুলাই মাসে সেখানে ছিলাম। এগুলো মেম্বার চেয়ারম্যানদের সুপারিশে করা হয়।’
তবে হিসাব সহকারী রাশিদুজ্জামান বলেন, ‘আমি যে তারিখে জয়েন করেছি সেই তারিখে তাদের (রোহিঙ্গা) একজন জন্মনিবন্ধন পেয়েছেন। সচিব সাহেব আমার নামে ৮ জুলাই হঠাৎ সার্ভারের পাসওয়ার্ড খুলে দেন। আমি তখন নতুন মানুষ, বুঝতে পারিনি।’
বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, ‘উদ্যোক্তা রাসেল এখানে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মাঝখানে এক বছর ছিলেন না। জন্মনিবন্ধন করতে মেম্বারের সুপারিশ তেমন লাগে না। উপর থেকে নিবন্ধন করতে চাপ দেওয়া হয়। তাই আমরা এগুলো দেখি না। আমাকে ইউএনও স্যার নির্দেশ দিয়েছে তাই বরখাস্ত করেছি।’ এই ঘটনার দায় আপনারও আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো পরে দেখা যাবে। কীসের থেকে কী হলো তদন্ত করে বোঝা যাবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের তদন্ত করে দেখতে হবে এই ঘটনায় কারা কারা জড়িত। কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’