সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা পাথর চুরি ঠেকাতে এবার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। টিলা এলাকায় প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে লোহার বেষ্টনী, যেন বড় ধরনের পাথরবাহী যানবাহন আর ভেতরে ঢুকতে না পারে।
গত ১৮ নভেম্বর রাতে শাহ আরেফিন মোড়ে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বেষ্টনীটি বসানো হয়। স্থানীয় লোকজন পথে লোহার বেষ্টনীকে বলছেন, ‘লোহার বেড়ি’। চুরির পথ বন্ধে এমন কৌশলটি প্রয়োগ করার আগে শাহ আরেফিন টিলা পরিদর্শনে গিয়ে পাথর লুটের চিত্র দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তিনি গত ১০ নভেম্বর টিলার পাথর লুট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিলে উপজেলা প্রশাসন একাধিক অভিযান চালিয়ে পাথর মজুতকারী ও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারী ১৫ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এরপর লোহার বেড়ি স্থাপন করা হয়।
এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে পাথর চুরির পথ বন্ধে প্রথম এ কৌশলটি প্রয়োগ করেছিলেন তখনকার ইউএনও মো. আবুল লাইছ। তার বদলির পর পরবর্তী ইউএনও কৌশলটি অব্যাহত না রাখায় চুরির পথ আবারও চালু হয়েছিল। আট বছর পর সেই একই কৌশল আবারও প্রয়োগ করা হলো।
সিলেটের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলাটি একটি ঐতিহ্যবাহী টিলা। লালচে ও বাদামি মাটিতে বড় বড় পাথরখণ্ডের টিলাটি প্রায় ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে সমাদৃত। কথিত আছে, হজরত শাহজালালের (রহ.) সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার একজন হজরত শাহ আরেফিন (রহ.) ওই টিলায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার ‘আসন’ হিসেবে টিলাটি শাহ আরেফিন টিলা নামে পরিচিতি পায়। ১৩৭ দশমিক ৫০ একর আয়তনের টিলাভূমি পুরোটা সরকারি খাস খতিয়ানের। টিলাভূমির পাশে খনিজ সম্পদের কিছু ভূমি থাকায় সেখানকার ইজারা বন্দোবস্ত প্রথায় টিলাভূমিতে পাথর উত্তোলন শুরু করে একটি চক্র।
২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি অবৈধভাবে পাথর তুলতে গিয়ে টিলাধসে একসঙ্গে ছয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের টনক নড়ে। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে টিলা প্রায় সমতলে পরিণত হলেও সেখানকার অবৈধ দখল মুক্ত করে উপজেলা প্রশাসন। টানা প্রায় ১০ মাসের চেষ্টায় টিলাভূমির সুরক্ষায় পথে পিলার স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে সেখানে পাথর চুরি বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু চুরির পথ বন্ধের পন্থাটি প্রয়োগকারী কোম্পানীগঞ্জের তৎকালীন ইউএনও মো. আবুল লাইছ বদলির পরপরই পিলার অপসারণ করা হয়। এরপর থেকে চুরির পথ উন্মুক্ত হয়।
শাহ আরেফিন টিলার আশপাশে বসবাসকারী সূত্রে জানা গেছে, শাহ আরেফিন টিলা এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। সেখানকার ৮৫ শতাংশ পাথর ইতোমধ্যে চুরি হয়ে গেছে। সম্প্রতি সাদাপাথর পর্যটন এলাকার পাথর লুট ও প্রতিস্থাপনে প্রশাসনিক ভূমিকা সফল হওয়ায় স্থানীয় মানুষজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শাহ আরেফিন টিলায় নজরদারি চলে। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্র জানায়, নতুন লোহার বেষ্টনী বসানোর ফলে ট্রাক, পিকআপ, ট্রাক্টরসহ বড় যানবাহন টিলায় প্রবেশ করতে পারবে না। এতে পাথর লুট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কের মুখে বক্স করা লোহার পাইপের বেড়ি। ওই পথটি ছিল শাহ আরেফিন টিলা এলাকায় যাতায়াতের সংযোগ সড়ক। লোহার বেড়ি থাকায় পাথরবাহী বড় বড় যান প্রবেশ করতে পারছে না। তবে যাত্রীবাহী অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত ছোট যান ওই এলাকা দিয়ে যেতে পারছে।
জেলা প্রশাসকের নির্দেশে এ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া। অন্যদিকে সপ্তাহখানেক পর্যবেক্ষণ করে সেখানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কথা জানান কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. রতন শেখ।
তিনি বলেন, ‘পথে লোহার বেষ্টনী স্থাপনের স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। দিন-রাত নিয়োজিত থাকবে আনসার ও নিরাপত্তা প্রহরী। পাশাপাশি অন্য কোনো পথ দিয়ে যেন চুরির পাথর বের করে নেওয়া না যায়, সে জন্য পুলিশের টহল আরও জোরদার করা হবে।’