দিনাজপুরের বিরলের উত্তর দারইল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে নানা অভিযোগ। স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা আর শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বিদ্যালয়টি যেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় বরং প্রধান শিক্ষক আর তার স্ত্রীদের ব্যক্তিগত পারিবারিক কর্মস্থলে পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষকরা নীরব, শিক্ষার্থীরা বিমুখ এবং অভিভাবকরা হতাশ।
২০২২ সালে উত্তর তারই নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় পরিচিতি পায় ‘পারিবারিক বিদ্যালয়’ হিসেবে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন প্রথমে তার প্রথম স্ত্রী সুলতানা পারভীনকে তৃতীয় শ্রেণির কেরানি পদে নিয়োগ দেন। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী নাজু পারভীনকে আয়া পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে বর্তমানে একই বিদ্যালয়ে কর্মরত স্বামী-স্ত্রী তিনজনই। স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা কেউই নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। প্রধান শিক্ষক প্রায়ই বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন, আর দুই স্ত্রীও বিদ্যালয়ে না এসেই নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন।
কাগজপত্র অনুযায়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৫০ জন দাবি শিক্ষকদের। কিন্তু গতকাল সোমবার এই প্রতিবেদক বার্ষিক পরীক্ষার দিন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোনো শিক্ষার্থীই স্কুলে উপস্থিত নেই। বরং কয়েকজন ছাত্রী সংবাদকর্মীদের দেখে বাইসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরীক্ষার হলে বা শ্রেণিকক্ষে কোথাও পরীক্ষার্থীর উপস্থিতি না থাকায় প্রশ্ন ওঠে, কাগজে দেখানো এই শিক্ষার্থীরা কোথায়?’ এ সময় সংবাদকর্মীরা হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে শিক্ষকরা দায় এড়িয়ে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের অনুমতি ছাড়া খাতা দেখানো যাবে না।’ এতে প্রকৃত শিক্ষার্থীর উপস্থিতির তথ্য অজানাই রয়ে যায়।
এর আগে গত তিন মাস আগে এনটিসিআর-এর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া দুজন নতুন শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত থাকলেও এখনো এমপিওভুক্ত হননি তারা। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকসহ ৬ শিক্ষক ও তার পরিবারের দুই স্ত্রী এবং আরও সব কর্মচারী নিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন।
সহকারী শিক্ষক বিভূতিভূষণ রায় ও খায়েরুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়টি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও দীর্ঘদিন অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বীকৃতির অভাবে কার্যক্রম স্থবির ছিল। কিন্তু এমপিওভুক্তির পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন অনুসন্ধানে তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষকের প্রথম স্ত্রী সুলতানা পারভীন বিরল উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের পদে ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ মনোনীত উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন। গত বছর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মামলা হওয়ায় তিনি পলাতক অবস্থায়ও নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন। শিক্ষকরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব থাকার কারণে তিনি কখনোই আওয়ামী সরকারের আমলেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতেন না। দ্বিতীয় স্ত্রী নাজু পারভীনও আয়া পদে থেকেও কার্যত কোনো দায়িত্ব পালন করেন না।
অভিভাবক মোকাররম হোসেন বলেন, ‘এই স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশই নেই। প্রধান শিক্ষকই যখন স্কুলে আসেন না, তার স্ত্রীদের কী দোষ?’ আরেক অভিভাবক হাসিনুর রহমানের অভিযোগ, ‘এটি এখন পরিবারতান্ত্রিক একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে পড়লে সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া কিছু নয়।’
প্রধান শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেনকে বিদ্যালয়ে না পাওয়ায় তার মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।’ পরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বা তার স্ত্রীদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, ‘অভিযোগগুলো আমার কাছে নতুন। খুব শিগগিরই তদন্ত করা হবে। স্বামী ও দুই স্ত্রী একই স্কুলে চাকরি, এটা অস্বাভাবিক। কেরানি যেহেতু পলাতক, তার বেতন-ভাতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাই করা হবে।’
দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রঞ্জু জানান, বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র দেখে স্থানীয়দের হতাশা স্বাভাবিক। এমন স্বজনপ্রীতি চলতে থাকলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ভেঙে পড়বে। উত্তর দারইল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ শুধু একটি স্কুলের সমস্যাই নয়, এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। দ্রুত তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া এ বিদ্যালয়কে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।