নওগাঁ বাইপাস সড়কের দুই পাশে ছিল সারি-সারি তালগাছ। দুই যুগ আগে সড়কটি তৈরির পর সান্তাহার-ঢাকা রোড থেকে মশরপুর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছগুলো রোপণ করা হয়। সম্প্রতি সড়কের এক পাশের সব গাছের মাথা (উপরের অংশ) কেটে ফেলা হয়েছে। বিদ্যুতের সরবরাহ লাইনের সুরক্ষা দিতে গাছগুলোর ওপর কুঠারের আঘাত করেছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) কর্মীরা।
একইভাবে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের সতীহাট বাজার থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়কের একপাশের হাজার-হাজার গাছ নষ্ট করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, পল্লিবিদ্যুতের লোকজন বছরে দুই থেকে তিনবার এসে গাছের মাথা ও ডাল কেটে দেয়। এতে উঠতি গাছগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এমন কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা। এসব বিষয়ে বিব্রত খোদ সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, অনিয়ম করে খুঁটি বসিয়ে তার টেনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি গাছ কাটা কিংবা গাছের ডাল ছেঁটে দেওয়ার অনুমতি পর্যন্ত নেয়নি নেসকো ও পল্লিবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে বাইপাস সড়কে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার তালগাছ। গাছগুলোর উচ্চতা ২০ থেকে ২৫ ফুট। সড়কের দক্ষিণ ধারে গাছের পাশেই বিদ্যুতের খুঁটি বসানো। খুঁটি ও তারের সুরক্ষায় দক্ষিণ পাশের গাছগুলোর ডাল ও মাথা কেটে দেওয়া হয়েছে। এর আগে যেসব গাছের ডাল কেটে দেওয়া হয়েছিল সেগুলো মারা গেছে। মরা গাছগুলো এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় বোয়ালিয়া গ্রামের আতোয়ার রহমান বলেন, ‘২০০২ সালে বাইপাস সড়ক নির্মাণের পরের বছর এই গাছগুলো রোপণ করা হয়। জগৎসিংহপুর ও বোয়ালিয়া গ্রামের কয়েকজন প্রকৃতিপ্রেমী বিভিন্ন এলাকা থেকে তালের বীজ সংগ্রহ করে সড়কের দুই পাশে রোপণ করেন। গাছগুলোর কারণে সড়কটির সৌন্দর্য বেড়ে যায়। কিছুদিন আগে সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণের জন্য অন্য গাছ কাটা হলেও তালগাছগুলো ছিল অক্ষত। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গাছের মাথা কেটে দেওয়া হয়েছে। ডালপালা ছেঁটে দেওয়ার কারণে ধীরে ধীরে গাছগুলো মরতে বসেছে। এর আগেও ডাল কাটার কারণে কিছু গাছ মরে গেছে।’ কিন্তু গাছগুলো বাঁচাতে কারও কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জগৎসিংহপুর গ্রামের বাসিন্দা ময়েন উদ্দিন বলেন, ‘বাইপাস সড়কের রামভদ্রপুর থেকে বটতলী বোয়ালিয়া পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটারে থাকা দক্ষিণ পাশের অন্তত সাড়ে সাত শ তালগাছ আক্রান্ত হয়েছে। সারি সারি এসব গাছের মাথা কেটে ফেলায় সড়কের সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। এভাবে গাছগুলোর মাথা কেটে দেওয়া ঠিক হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলেও কেউ শোনে না। উল্টো আইনের মাধ্যমে হয়রানির হুমকি দেয়।’
তিনি বলেন, ‘দিন দিন তালগাছ হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই গাছগুলো রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসছে না। বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ৪ থেকে ৫ ফুট দূরে সরিয়ে নিলে গাছগুলো রক্ষা পেত।’ বিদ্যুৎ বিভাগের এই কর্মকাণ্ডে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ বলে জানান তিনি।
নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কে গিয়ে দেখা যায়, এই সড়কের উন্নয়নকাজ কিছুদিন আগে শেষ হয়েছে। বছর দুয়েক আগে সড়কের দুই পাশে বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়। গাছগুলো এখন বড় হয়েছে। এতে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি ছাঁয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু সতীহাট থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত সড়কের পূর্বপাশে ১০ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতায় রেখে সব গাছের মাথা কেটে ফেলা হয়েছে।
সতীহাট বাজারের বাসিন্দা আনিছুর রহমান বলেন, ‘বছরখানেক আগে সড়কের পাশে গাছের মধ্যেই বিদ্যুতের খুঁটি বসায় পল্লিবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে সড়ক বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা আপত্তি জানালেও রাতারাতি পল্লিবিদ্যুতের লোকজন খুঁটি বসিয়ে তার টেনে চলে যায়। এ বছর পল্লিবিদ্যুতের কর্মীরা এসে গাছের মাথাগুলো ছেঁটে দেয়। এ সময় প্রতিবাদ করলে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দেয়। সড়কের একপাশের গাছ আছে অন্যপাশ খাঁখাঁ করছে। যাতায়াতকারীরা ছায়া পাচ্ছেন না।’
খলিলুর রহমান নামে আরেকজন বলেন, ‘বিদ্যুতের তার রক্ষা করতে এই সড়কে ১৫-২০ হাজার গাছের মাথা কেটে দেওয়া হয়েছে। গাছগুলো আর বড় হতে পারছে না। এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।’ এমনভাবে বৃক্ষ নষ্ট না করার দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নওগাঁ কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কারণে-অকারণে প্রায়ই সড়কের পাশের গাছ কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ গাছ কাটা হয় তার মাত্র পাঁচ শতাংশ রোপণ করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।’
স্থানীয় পরিবেশকর্মী নাইস পারভীন বলেন, ‘নওগাঁয় প্রতি বছর বজ্রপাতে অনেক মানুষ মারা যান। বজ্রপাত রোধে তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব গাছ না থাকলে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
এ বিষয়ে নওগাঁ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল হক বলেন, ‘সড়কের পাশের গাছগুলো আইন লঙ্ঘন করে কাটা হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫ অনুযায়ী- সড়কের জায়গায় অনুমতি সাপেক্ষে সীমানার শেষ প্রান্ত ব্যবহার করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ সেই আইন মানেনি। এমনকি গাছ কাটা বা ছাঁটাইয়ের অনুমতিও নেয়নি। বিষয়টি জানার পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নেসকোর নওগাঁ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজিমুল হক দাবি করেন, ‘গাছগুলো বিদ্যুৎ লাইন বসানোর পর লাগানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়ম মেনেই গাছের ডাল ও মাথা ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। এতে হয়তো গাছগুলোর ক্ষতি হতে পারে তবে মরে যাওয়ার কথা নয়।’
ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫ অনুসরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিধিমোতাবেক বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছে। পরে সড়ক সম্প্রসারণ করায় সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।’