রাজশাহীতে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সংকট এখন স্থানীয়দের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেসরকারি ফার্মেসি- কোথাও মিলছে না জীবনরক্ষাকারী এ ভ্যাকসিন। ফলে কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। অনেকে এরই মধ্যে কয়েক ডোজ ভ্যাকসিন নিলেও কোর্স কমপ্লিট করতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ একটি ডোজও নিতে পারেননি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বছরের পর বছর বিনামূল্যে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হতো। কিন্তু তিন সপ্তাহ ধরে সেখানে ভ্যাকসিনের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগে একাধিকবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমন সমস্যা কেবল রাজশাহীতে নয়, পুরো দেশেই একই অবস্থা।
রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ২৭০ থেকে ২৮০ জন রোগী এখানে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসেন। মাসিক চাহিদা প্রায় সাড়ে ৮ হাজার ডোজ হলেও বর্তমানে একটিও মজুত নেই। এতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ভ্যাকসিন না পেয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে যাচ্ছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, কুকুরের কোনো নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুম না থাকলেও ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে তাদের প্রজনন তৎপরতা তুলনামূলক বেশি থাকে। বর্তমানে অনেক এলাকায় কুকুর বাচ্চা প্রসব করায় তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ফলে মানুষকে কামড়ানোর ঘটনা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে রোগীরা ছুটছেন নগরীর বিভিন্ন ফার্মেসিতে। কিন্তু সেখানেও ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। রামেক হাসপাতালকে ঘিরে লক্ষ্মীপুরসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা একাধিক ওষুধের দোকানে খোঁজ করেও ভ্যাকসিন পাওয়া যায়নি।
নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার একটি ফার্মেসির কর্মী নাম প্রকাশ না করে জানান, প্রতিদিন বহু রোগী ভ্যাকসিনের খোঁজে আসছেন, কিন্তু কোম্পানি থেকে কোনো সরবরাহ না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। ভ্যাকসিনের একটি ভায়ালের দাম সাধারণত ৪০০ টাকা হলেও বর্তমানে তা পাওয়াই যাচ্ছে না।
এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ভুক্তভোগীরা। নগরীর কুখুন্ডি বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা কুদ্দুস আলীর মেয়েকে দুই সপ্তাহ আগে কুকুরে কামড় দেয়। তিনি হাসপাতাল থেকে দুটি ডোজ বিনামূল্যে পেলেও একটি ডোজ বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। গতকাল শনিবার তার মেয়ের আরেকটি ডোজ দেওয়ার কথা, কিন্তু ভ্যাকসিন না পাওয়ার আশঙ্কায় তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
একইভাবে আলী হোসেন (১৮) কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে রামেক হাসপাতালে আসেন ভ্যাকসিন নিতে। বিনামূল্যে ভ্যাকসিন না পেয়ে ফার্মেসিতে খোঁজ করেও ব্যর্থ হন তিনি। আলী হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে বাড়ি থেকে বিকাশে টাকা আনিয়েছি, কিন্তু কিনতেও পারলাম না। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, ভ্যাকসিন সংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। কিছু সময় চাহিদার তুলনায় কম ভ্যাকসিন এলেও গত ২১ দিন ধরে আর কোনো ভ্যাকসিনই আসছে না। ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাফরুল হোসেন বলেন, এ সংকট কেবল রাজশাহীতেই নয়, সারা দেশেই একই অবস্থা। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।