রাজশাহীতে বাণিজ্যিক কোচিং নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে প্রশাসনের ব্যর্থতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা কার্যত মুখথুবড়ে পড়েছে। এর ফল ভোগ করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। একদিকে অনিয়মিত পাঠদান, অন্যদিকে গলার কাঁটা কোচিং ফিতে বাড়তি আর্থিক চাপ সইতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
এদিকে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে গত বছরের জুন ও সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহী বিভাগীয় প্রশাসনের সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়— কোনো শিক্ষক কোচিং সেন্টার বা কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে যুক্ত, তা সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), রাজশাহী অঞ্চল থেকে সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়। নির্দেশ ছিল, কোচিং বা কিন্ডারগার্টেন কার্যক্রমে যুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঠাতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান তথ্য দিয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এ নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে।
মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মোহা. আছাদুজ্জামান স্বীকার করেছেন, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশের শিক্ষক বাণিজ্যিক কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। তবে বাস্তবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এখন কলেজে নিয়মিত না এসে কোচিং সেন্টারেই বেশি সময় দিচ্ছেন। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা বাস্তবে জটিল।’
নির্দেশনা অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না— এ প্রশ্নে তিনি জানান, ‘তার অধীনে প্রায় এক হাজার কলেজ রয়েছে। সবাইকে শোকজ করা এবং পরে সেটিও অমান্য হলে কী করা হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মাউশির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কোচিংবাণিজ্য বন্ধে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক চাপ। বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে রাজনৈতিক মহল থেকে চাপ ও হুমকি আসে।
শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা যে কেবল নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়, তা উঠে এসেছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও। ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, তার নিজের সন্তানও কলেজে নিয়মিত না গিয়ে কোচিং সেন্টারে যায়। কারণ কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয় না। শিক্ষকরাও মনোযোগ দিয়ে পড়ান না।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে বা কোনো কোচিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষই কোচিংবাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সহযোগিতা করেন না।
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার কথা বলছে। রাজশাহী নগরের এক কলেজশিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তার অভিযোগ, পুরো সিলেবাস শেষ করা হয় কোচিং সেন্টারে। আর কলেজে ক্লাস হয় অনিয়মিত ও তাড়াহুড়ো করে।
অন্যদিকে অভিভাবকরা বলছেন, কোচিং এখন আর পছন্দের বিষয় নয়, এটি বাধ্যতামূলক খরচে পরিণত হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীর এক অভিভাবকের ভাষ্য, কলেজ ফি ও পরীক্ষার ফি দেওয়ার পর আবার একই শিক্ষকদের কোচিং ফি দিতে হচ্ছে। কোচিং না করলে সন্তানকে ক্লাসে গুরুত্বই দেওয়া হয় না।
এদিকে রাজশাহীর অনেক কোচিং সেন্টারে নেওয়া হচ্ছে গলাকাটা ফি। ভর্তির সময়েই অনেক ক্ষেত্রে পুরো বছরের টাকা অগ্রিম আদায় করা হচ্ছে। বিষয় ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এককালীন ৩০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার রাজনৈতিক সমর্থন ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার অভাবেই এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দীপক দাস বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদানের ঘাটতি, জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষকদের দ্রুত অর্থবান হওয়ার মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ যদি একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিত, তা হলে তা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়াত।’ তার মতে, নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদাসীনতা এবং শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয়ই এই শিক্ষাবিরোধী চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছে, এটাই মূল সংকট।’