দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভারত সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুর। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এখন ভোটের হাওয়া বইছে। নিজ নিজ দলের মার্কার পক্ষে প্রতিটি দলের প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন। দিচ্ছেন উন্নয়ন ও পরিবর্তনের নানান প্রতিশ্রুতি। তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের মার্কার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রতীকের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। সরকারি সব দপ্তরের পক্ষ থেকেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালানো হচ্ছে। অথচ মাঠ পর্যায়ে এসব প্রচারের তেমন প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ভোটারই গণভোট সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানেন না। কেউ শুনে থাকলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী হবে, কীভাবে এই ভোট দিতে হবে তা বিস্তারিত জানেন না। একজন অধিকারকর্মীর ভাষায়, জেলার ৮৫ শতাংশ ভোটারের কাছে এখনো গণভোট সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছায়নি।
জানা গেছে, মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর-১ আসন। এ ছাড়া গাংনী উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে মেহেরপুর-২ আসন। নারী-পুরুষ মিলিয়ে জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬৮০ জন। এ জেলার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকা চায়ের দোকানি কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহবধূ, বেশির ভাগ মানুষের কাছে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের পক্ষে তেমন কোনো তথ্য নেই।
গাংনী উপজেলার বামন্দী গ্রামের গৃহবধূ পপি খাতুন বলেন, ‘এত দিন জানতাম, যে মার্কায় ভোট দেব সেই মার্কা জিতবে। এবার শুনছি একই দিন আরেকটি ভোট হবে। কীভাবে হবে, কেন হবে তা জানি না।’
একই উপজেলার দেবীপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর নাকি দুটো ভোট দিতে হবে। গণভোট কীভাবে দেব, দিলে কী হবে, আর না দিলে কী হবে সেটাই তো বুঝি না। কেউ এসে আমাদের বুঝিয়ে বলেও না।’
সদর উপজেলার আমঝুপি বাজারের চা-দোকানি সিফাত আলী অবশ্য গণভোট সম্পর্কিত প্রশ্ন শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। বলেন, ‘গণভোট আবার কী বাপ! আজই প্রথম শুনলাম। ৬৫ বছর বয়স আমার। জীবনে কত কিছুই দেখলাম।’
গণভোট নিয়ে কোনো প্রচার এলাকায় আসেনি জানিয়ে কুলবাড়ীয়া গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘‘মেম্বার থেকে চেয়ারম্যান ও এমপি ভোটের বিষয়ে জানি, কিন্তু গণভোট তো জানি না। আবার শুনছি ‘হ্যাঁ’- ‘না’ও আছে। কেউ বুঝিয়ে না বললে বুঝব কীভাবে? আমাদের গ্রামে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রচার হতে দেখিনি।’’
এদিকে সরকারি উদ্যোগে নেওয়া প্রচার মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামের সুচিত্রা মণ্ডলের কাছে না পৌঁছালেও ফেসবুকের কল্যাণে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেয়েছেন। তার দাবি, ‘হ্যাঁ ও না ভোট সম্পর্কে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটাররা কিছুই জানেন না।’ একই উপজেলার মোনাখালী গ্রামের কৃষক আহাদ আলী মোল্লা বলেন, ‘১২ তারিখে ভোট হবে জানি, কিন্তু গণভোট সম্পর্কে কিছু জানি না। কোনো নেতা এসে এখনো গণভোটের ভোট চাননি।’
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর এবং ১১-দলীয় জোট বিভিন্ন ভাবে প্রচার চালাচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে সাইনবোর্ড, ব্যানার টাঙানোসহ অটোরিকশার মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে এই প্রচার খুব বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে মনে করে সচেতন মহলের একাংশ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মেহেরপুর কমিটির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, ‘গণভোটের প্রচার সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা পৌঁছায়নি। জেলার সর্বোচ্চ ১৪-১৫ শতাংশ ভোটার গণভোট সম্পর্কে জানেন। বাকিরা এ সম্পর্কে অবগত নন।’
জেলা জামায়াতের আমির ও মেহেরপুর-১ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাওলানা তাজ উদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা আমাদের নির্বাচনি প্রচারের সব পর্যায়ে ভোটারদের হ্যাঁ-এর পক্ষে অবস্থান নিতে বলছি।’ মেহেরপুর-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আমজাদ হোসেন বলেন, ‘সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে কে বিজয়ী হবে তা জনগণ নির্ধারণ করবে। আমরা ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোট নিয়ে প্রচার চালাচ্ছি।’
জেলা তথ্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিভিন্ন গ্রামের হাট-বাজারে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচার অব্যাহত আছে। এ ছাড়া সব সরকারি দপ্তর থেকেও গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার চলছে। কতভাগ ভোটারদের কাছে হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচার পৌঁছেছে এটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন।’