কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত পিচঢালা সড়কগুলো এখন নোনাপানির গ্রাসে বিলীন হতে চলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের সাদা সোনা খ্যাত লবণ এই অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও পরিবহনের চরম অব্যবস্থাপনায় ধ্বংস হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো। ত্রিপলবিহীন কিংবা নামমাত্র পাতলা পলিথিন দিয়ে লবণ পরিবহনের ফলে সড়কের ওপর দিয়ে অবিরত পড়ছে তীব্র ক্ষারীয় পানি, যা বিটুমিনকে গলিয়ে রাস্তাকে পরিণত করছে মরণফাঁদে।
সড়কের এই ভয়াবহ দশা নিয়ে কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। কক্সবাজার সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসককে (ডিসি) জানিয়েছি। এরপর ডিসি পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে লবণ ব্যবসায়ীরা এই নির্দেশনা তোয়াক্কাই করছেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসলে আমাদের তো নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট নেই যে, সরাসরি অভিযান চালাব। আমি আবারও ডিসি ও পেকুয়া ইউএনওর সঙ্গে কথা বলব। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তার মারাত্মক ক্ষতি হবে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মগনামা ও রাজাখালী মাঠ থেকে লবণ তুলে রাস্তার পাশেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এসব স্তূপ ঢাকা দেওয়ার জন্য লোক দেখানো পাতলা পলিথিন ব্যবহার করা হলেও লবণের বড় একটি অংশ রাস্তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে। মূলত এসব পয়েন্ট থেকেই ছোট ডাম্পারে লবণ তুলে বড় ট্রাকের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র লক্ষ করা গেছে বানৌজা সাবমেরিন সড়কের মগনামা অংশে। মগনামার বিভিন্ন পয়েন্টে বড় ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে থাকে এবং সেখানেই ছোট ডাম্পার থেকে লবণ ট্রাকে তোলা হয়। এই লোডিং প্রক্রিয়ায় মানসম্মত কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। লবণ থেকে পড়া পানি আর ছড়িয়ে পড়া লবণে পুরো সড়ক একাকার হয়ে যায়। একই চিত্র দেখা গেছে রাজখালী সড়কেও। সেখানে বড় ট্রাক ঢোকার সুযোগ থাকায় রাস্তার ওপরই সরাসরি দীর্ঘ সময় ধরে লোডিং চলে। পাতলা পলিথিনের আস্তরণ ভেদ করে নোনাপানি সরাসরি পিচঢালা পথে মিশে যাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মগনামা থেকে লবণবোঝাই করার পর ট্রাকগুলো যখন বরইতলী রাস্তার মাথা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং মগনামা থেকে বাঁশখালী সড়ক দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয় তখন বিপদ আরও ঘনীভূত হয়। লবণ সঠিকভাবে পানিনিরোধক ত্রিপল বা মোটা পলিথিন দিয়ে ঢাকা না থাকায় চলন্ত ট্রাক থেকে অনবরত নোনাপানি চুইয়ে সড়কে পড়তে থাকে।
এই লবণপানি পিচঢালা সড়কের বিটুমিনের স্তরকে যেমন আলগা করে দিচ্ছে তেমনি পুরো রাস্তায় একটি অদৃশ্য পিচ্ছিল আস্তরণ তৈরি করছে। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য যানবাহনের চাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ছোট গাড়িগুলো ব্রেক করলেই উল্টে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ মগনামা থেকে বাঁশখালী ও বরইতলী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ জনপথ এখন লবণের পানির কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
প্রকৌশলীদের মতে, নোনাপানি বিটুমিনের আঠালো ভাব দ্রুত নষ্ট করে ফেলে। ফলে পাথরগুলো আলগা হয়ে যায় এবং ভারী যানবাহনের চাপে রাস্তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। সওজ সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা এভাবে নোনাপানি পড়লে ৩ বছরের টেকসই সড়ক ৬ মাসও টিকবে না। এ ছাড়া কুয়াশার সঙ্গে এই নোনাপানি মিশে রাস্তা সাবানের মতো পিচ্ছিল হয়ে যায়, যার ফলে মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ছে। গত এক সপ্তাহে এই সড়কে ডজনখানেক ছোট-বড় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। সরকারি সম্পদের ক্ষতি করে ব্যবসা করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আমরা দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা ও জরিমানা নিশ্চিত করব।’
স্থানীয়রা মনে করছেন, লবণশিল্প এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ হলেও সড়ক অবকাঠামো রক্ষা করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে তা বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হবে। তদারকি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
মোহাম্মদ দিদার নামে একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘রাস্তাটা আমাদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। কিন্তু লবণের গাড়ির কারণে রাস্তাটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ডিসি-ইউএনওর নির্দেশ যদি ব্যবসায়ীরা না মানেন, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?’