ভোরের আলো ফুটতেই দূর থেকে চোখে পড়ে সাদা মার্বেলে মোড়া গম্বুজ আর আকাশছোঁয়া মিনার। কাছে এগোতেই সেই সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়, এ যেন চোখের ভালো লাগা নীরব এক প্রশান্তি। সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে দাঁড়িয়ে থাকা আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, স্থাপত্য সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক আবহে এটি হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের নতুন কেন্দ্রবিন্দু।
সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বেলকুচি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মুকন্দগাতী মহল্লায় গেলে দেখা মিলবে এমন এক মসজিদের। প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর ৩১ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা মসজিদটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা।
সিরাজগঞ্জ-এনায়েতপুর সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত মসজিদটির সাদা মার্বেলে মোড়ানো গম্বুজ দূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয়। কাছে গেলে অনুভূত হয় একধরনের শান্ত পরিবেশ। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং একটি অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেলকুচি উপজেলার ব্যবসায়ী মরহুম মোহাম্মদ আলী সরকার ব্যক্তিগত অর্থায়নে ২০১২ সালে বেলকুচি পৌর ভবনের পাশে প্রায় এক একর জমির ওপর তার ছেলে আল-আমান ও মা বাহেলা খাতুনের নামে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তবে ২০২০ সালের ২ আগস্ট উদ্বোধনের আগেই তিনি মারা যান। পরে তার ছেলেরা নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ২০২২ সালের ২ এপ্রিল জুমার নামাজের মাধ্যমে মসজিদটির উদ্বোধন করেন। এর পর থেকেই এটি ব্যাপকভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রায় ৯ বছর ধরে দেশি-বিদেশি কারিগরের সমন্বয়ে আধুনিক নকশায় নির্মিত মসজিদটিতে ভারত, ইতালি ও তুরস্ক থেকে আনা মার্বেল ও গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া মসজিদের ভেতরে আকর্ষণীয় ঝাড়বাতি আনা হয়েছে চীন থেকে।
মসজিদ কমিটি জানিয়েছে, পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে প্রতিদিন মুসল্লিদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় ৭ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদ পরিচালনায় রয়েছেন দুজন ইমাম, চারজন খতিব, ছয়জন খাদেম এবং একটি পরিচালনা পর্ষদ।
বেলকুচি উপজেলার চালা এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘মসজিদের মাঝখানে বিশাল একটি গম্বুজ এবং দুই পাশে ১১০ ফুট উচ্চতার দুটি মিনার রয়েছে। পাশাপাশি ছোট আটটি গম্বুজও আছে। মার্বেল পাথরের পিলার ও কারুকাজ করা টাইলসে নির্মিত হওয়ায় প্রচণ্ড গরমেও ভেতরে শীতল পরিবেশ অনুভূত হয়।’
পৌর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মাদ আলী জানান, মুসল্লিদের জন্য দুটি আধুনিক অজুখানা ও শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ দেখতে এবং এখানে নামাজ আদায় করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন।
মসজিদটির খতিব মাওলানা গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘এখানে দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য বড় আমানত। মানুষ যখন মনোযোগ দিয়ে নামাজ আদায় করেন, তখন বোঝা যায় এটি শুধু স্থাপত্য নয়—আল্লাহর ঘর হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।’
মসজিদ কমিটির পরিচালক ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘শুধু বড় মসজিদ নয়, একটি পরিপূর্ণ কমপ্লেক্স গড়ে তোলাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের থাকার ব্যবস্থা, অজুর আধুনিক সুবিধাসহ সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা বয়সী মানুষ মসজিদটি দেখতে ও নামাজ আদায় করতে আসছেন।’