কেউ তহশিলদার বা নায়েবের চেয়ারে বসে কম্পিউটারে কাজ করছেন। কেউ খাজনা আদায় করছেন। কেউ আবার অফিসের অন্য কাজে ব্যস্ত। তারা যখন তখন গোপন নথির কক্ষে প্রবেশ করছেন। তারা কেউই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী না, তবু তারা সরকারি কাজ করছেন। তারা একেকজন যেন বড় কর্মকর্তা! এদিকে সেবাগ্রহীতারা বাধ্য হয়ে কাজের জন্য তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। এমন দৃশ্য দেখা যায় ঢাকার ধামরাই উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলাসহ ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। ফলে অফিশিয়াল কাজের জন্য বহিরাগতদের সহায়তা নিতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে ৭-৮ জন করে বহিরাগত লোক কাজ করছে। আর তারাই যেন অফিসের বড়কর্তা। প্রতিটি অফিসেই এমন চিত্র।
স্থানীয়রা আরও জানান, বহিরাগতদের সহায়তা নেওয়া কতটুকু বিধিসম্মত? আর তাদের বেতন আসে কীভাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বহিরাগতদের দৈনিক মজুরি গুনতে অসদুপায় অবলম্বন করতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। এ ছাড়া সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া এ বহিরাগতদের বিরুদ্ধে অসদুপায়ের লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে জানা গেছে, উপজেলা ভূমি অফিসে মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ১৭টি। তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন। বাকি পদগুলো শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কানুনগো পদটি প্রায় ১ বছর ধরে শূন্য রয়েছে। সার্ভেয়ার ২ জন থাকার কথা থাকলেও আছেন ১ জন। এখানে সংযুক্তিতে আছেন ৩ জন। নাজির-কাম-ক্যাশিয়ার ও মিউটেশন-কাম-সার্টিফিকেট সহকারী পদ শূন্য রয়েছে। সার্টিফিকেট সহকারী পদে একজন থাকলেও তিনি সংযুক্তিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ক্রেডিট চেকিং-কাম-সায়রাত সহকারী ২, প্রসেস সার্ভার ২, চেইনম্যান ১, অফিস সহায়কের ২টি পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে ১টি করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থাকার কথা রয়েছে। এ উপজেলায় ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়নে ভূমি অফিস রয়েছে। এসব ভূমি অফিসে মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ১ জন, উপসহকরী কর্মকর্তা ২ ও অফিস সহায়ক ২ জন।
জানা গেছে, ধামরাই সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অফিস সহায়ক পদে ২টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। রোয়াইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও অফিস সহায়কের ১টি পদ শূন্য রয়েছে। কুশুরা ইউনিয়নে সহকারী কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি উপসহকারী পদে ২ জনের মধ্যে ১ জন রয়েছেন। তিনি আবার অন্য জায়গায় ডিউটি করেন। তবে বেতন নিচ্ছেন এ অফিস থেকে। এ ছাড়া ২ জন অফিস সহায়কের মধ্যে ১ জন উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছেন। এদিকে সুয়াপুর ইউনিয়নে ভূমি সহকারী পদটি রয়েছে শূন্য।
আবার উপ-সহকারী ২ জনের মধ্যে ১টি ও অফিস সহায়কের ২টির মধ্যে ১টি পদ শূন্য রয়েছে। বালিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে উপ-সহকারীর ১টি পদ শূন্য রয়েছে। যাদবপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ভূমি সহকারীর ১টি, উপসহকারীর ২টির মধ্যে ১টি ও অফিস সহায়কের ২টি পদই রয়েছে শূন্য।
ভাড়ারিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের জন্য ইউনিয়নের গাজীপুর এলাকায় আধুনিক ভবন নির্মাণ করে ২০২২ সালের ২৫ জুলাই অফিস কার্যক্রমের উদ্বোধন শুরু করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শহিদুল ইসলাম। ওই সময় একজন ভূমি উপসহকারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি নতুন ভবনে ৭-৮ দিন বসে এলাকার জনগণকে ভূমিসংক্রান্ত সেবা দেন। বর্তমানে ওই অফিস তালা বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে জয়পুরা এলাকায় সোমভাগ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভবন নির্মাণ করা হলেও জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সদর ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের দিয়েই অফিস কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এ অফিসগুলোতে দীর্ঘদিন জনবলসংকটের কারণে এলাকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জনবল সংকটের কারণে বহিরাগতদের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের। এর ফলে অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন হচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রিদওয়ান আহমেদ রাফী বলেন, ‘জনবলসংকটের বিষয় একাধিক বার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি।’
এ ব্যাপারে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আবদুর রাফিউল বলেন, ‘ভূমি অফিসগুলোতে কিছুটা জনবলসংকট রয়েছে জানি। তবে কিছু পদের বিপরীতে প্রমোশন হলে পদগুলো ফাঁকা হবে। তখন নতুন নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদের বিপরীতে জনবল বাড়ানো যাবে।’