স্বপ্না ও রোকসানা, দুটিই ছদ্মনাম। তাদের জীবনের গল্প আলাদা হলেও যন্ত্রণার পথ প্রায় একই। বিয়ের পর যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, সংসার ভেঙে যাওয়ার বেদনা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা–সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা আজ স্বাবলম্বী হওয়ার পথে হাঁটছেন।
দিনাজপুরের সদর উপজেলার এক গ্রামের বাসিন্দা স্বপ্নার বিয়ে হয় ২০২২ সালে। বিয়ের সময় তার পরিবার ৬ লাখ টাকা যৌতুক দিলেও কিছুদিন পর আবারও টাকার দাবি করেন স্বামী। দাবি পূরণ করতে না পারায় শুরু হয় নির্যাতন। একপর্যায়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হতে হয় তাকে। সালিশ-বৈঠক ও মামলা-মোকদ্দমা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অবশেষে ২০২৪ সালে ছোট সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। বর্তমানে মামলা চলমান থাকলেও স্বামী কোনো ভরণপোষণ দেন না। নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে এখন তিনি কম্পিউটার গ্রাফিক্সের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
একইভাবে রোকসানার সংসারও ভেঙে যায় নির্যাতনের কারণে। বিয়ের এক বছর পর কন্যাসন্তানের জন্ম হলে তাকে নানা অজুহাতে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে জানতে পারেন, তার স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। ২০২২ সালে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয় তাকে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেনমোহরের টাকা পেলেও সন্তান ও নিজের ভরণপোষণ পাননি। বর্তমানে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্যের কাপড় সেলাই করে নিজের ও সন্তানের খরচ চালাচ্ছেন।
স্বপ্না ও রোকসানার মতো অসংখ্য নারী প্রতিদিন যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে সালিশ বা মামলা হলেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলছে না। ফলে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি জীবিকা অর্জনের সক্ষমতা তৈরি করাও তাদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নির্যাতনের প্রবণতা পুরোপুরি কমছে না।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে আসছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘পল্লীশ্রী’। সংস্থাটি ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ৮৪৭ জন নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৭৩৫টি অভিযোগ সালিশ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। শুধু সমস্যা সমাধানই নয়, নির্যাতিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতেও কাজ করছে সংস্থাটি। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় তাদের কম্পিউটার, সেলাই, বুটিকস, ব্যাগ তৈরি, সুতা দিয়ে হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে অনেককে প্রাথমিক মূলধন সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
পল্লীশ্রীর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৯৭ জন নির্যাতিত নারীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৩৩ জন, যৌতুকজনিত নির্যাতনের শিকার ১৫ জন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২৯ জন নারী রয়েছেন। এ ছাড়া জমিজমা বিরোধ, মানসিক নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, যৌন হয়রানি ও পরকীয়াজনিত নির্যাতনের শিকার আরও ২০ জন নারী সহায়তা পেয়েছেন।
একই সময়ে ১১৫ জন নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৭ জন সেলাই পেশায় যুক্ত হয়েছেন, ২০ জন মুদি দোকান পরিচালনা করছেন, ১৪ জন হোটেল ও চায়ের দোকান চালাচ্ছেন। এ ছাড়া কেউ প্রসাধনীর দোকান, কেউ ব্যাগ তৈরির কাজ, কেউ অনলাইন ব্যবসা কিংবা দুগ্ধ ব্যবসার মাধ্যমে আয় করছেন।
পল্লীশ্রীর নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম বলেন, ‘নারী নির্যাতনের ঘটনা কমাতে হলে বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক মূলধন সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে নারীদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সহায়তা করছি।’
তিনি বলেন, ‘একজন নারী যখন নিজের আয়ের উৎস তৈরি করতে পারেন, তখন তিনি শুধু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তিই পান না, নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎও নিরাপদ করতে পারেন।’