ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব ইতিহাস। ভাঙাচোরা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা আর আগাছায় ঢেকে যাওয়া প্রাঙ্গণ-এ সবকিছুর মাঝেই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার কিংবদন্তি নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মভিটা।
একসময় যে জমিদারবাড়ির আঙিনায় ছিল মানুষের পদচাণ ও প্রাণচাঞ্চল্য, সেখানে এখন নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। অবিভক্ত বাংলার এই প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক, কৃষক-প্রজার অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত ও ‘শেরেবাংলা’ খ্যাত এ কে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন। অথচ শতবর্ষ পেরিয়ে সেই ঐতিহাসিক স্থাপনাই আজ অবহেলা ও অযত্নে ধুঁকছে।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নের মিয়া বংশের পুরোনো জমিদারবাড়িতে পা রাখলেই চোখে পড়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটা। একসময় ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভাঙাচোরা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা আর আগাছায় ঢেকে যাওয়া আঙিনা যেন দীর্ঘদিনের অবহেলা আর অযত্নের সাক্ষ্য বহন করছে। কোথাও কোথাও উন্মুক্ত হয়ে আছে শতবর্ষী ইটের গাঁথুনি, আবার বিভিন্ন দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। চারপাশজুড়ে ঝোপঝাড়ের বিস্তার ভবনটিকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটির ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দিনের বেলাতেও নির্জন ও অযত্নে পড়ে থাকা ভবনটি অনেকটা পরিত্যক্ত বাড়ির মতো। অথচ এই জন্মভিটা বহন করছে বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মৃতি। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষার্থী ও ইতিহাস-অনুরাগীরা শেরেবাংলার স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান দেখতে আসেন। তবে জরাজীর্ণ ভবন ও অব্যবস্থাপনা দেখে অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যান।
স্থানীয়রা জানান, ২০১০ সালের ১৮ মার্চ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর শেরেবাংলার জন্মভিটাকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করে। একই বছর একটি নামফলক স্থাপন ও সীমিত পরিসরে সংস্কারকাজ করা হয়। পরে ২০১৭ সালে ভবনের ছাদের কিছু অংশ মেরামত করা হলেও এরপর আর কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার পর এলাকাবাসী আশা করেছিলেন জন্মভিটাটি একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক স্থানে পরিণত হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দ্রুত সংস্কার না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতাতেই শেরেবাংলার জন্মভিটার কথা পড়বে।
শেরেবাংলার নিকটাত্মীয় হোসনেয়ারা বেগম বুলু দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির একটি অংশে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে ছাদের কিছু অংশ মেরামত করা হয়েছিল। এরপর আর কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। বৃষ্টি, রোদ ও সময়ের ক্ষয়ে ভবনটির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।
ইতিহাসবিদ সিরাজ উদ্দিন আহমদের মতে, সাতুরিয়ার এই জমিদারবাড়ি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে এই গ্রামে। বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে এখানেই তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতে খড়ি।
বরিশালের গবেষক ও লেখক কবি হেনরী স্বপন বলেন, সাতুরিয়া গ্রামের পুরোনো জমিদারবাড়ির ভাঙা দেয়ালে হাত রাখলে যেন ইতিহাসের স্পন্দন অনুভব করা যায়। এই বাড়িতেই ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্ম নিয়েছিলেন অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তি নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক।
তিনি আরও বলেন, শেরেবাংলার জন্মভিটাকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হোক। এতে নতুন প্রজন্ম দেশের ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে এবং এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, শেরেবাংলার জন্মভিটা সংরক্ষণের বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।