রাজশাহীতে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় গাছে গাছেই নষ্ট হচ্ছে কাঁচা ও আধা পাকা লিচু। এতে বাজারে তোলার আগেই ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা।
চাষিরা বলছেন, কয়েক দিনের টানা গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় লিচুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। খোসা দ্রুত প্রসারিত ও সংকুচিত হওয়ায় ফল ফেটে যাচ্ছে। এতে ফলের গুণগত মান যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি উৎপাদন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলায় ৫২৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭৬৮ টন। চলতি মৌসুমে আবাদ কিছুটা কমে ৫২৬ হেক্টরে নেমে এলেও উৎপাদন বাড়ার আশায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৫ টন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গড়ে প্রতি কেজিতে ৪০টি লিচু ধরে হিসাব অনুযায়ী ১০০টি লিচুর ওজন আড়াই কেজি হয়। আর ১০০ লিচুর গড় মূল্য ধরা হয়েছে ৪০০ টাকা। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে অর্ধকোটি টাকার লিচুর ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে; যা আগের তুলনায় কম।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক দিনে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। গতকাল সোমবার বেলা ৩টায় রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর্দ্রতা ৫০ শতাংশ। এর আগে ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর্দ্রতা মাত্র ১৮ শতাংশ। ১৬ এপ্রিল তাপমাত্রা কমে ৩৪ দশমিক ২ ডিগ্রিতে নামলেও আর্দ্রতা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশে। ১৭ এপ্রিল আবার তাপমাত্রা বেড়ে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি হয়, আর্দ্রতা ৪৬ শতাংশ। ১৮ এপ্রিল সকালে আর্দ্রতা হঠাৎ বেড়ে ৯৮ শতাংশে পৌঁছায়, সেদিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি। ১৯ এপ্রিল তাপমাত্রা কিছুটা কমে ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি হলেও আর্দ্রতা ছিল ৭৭ শতাংশ। তবে এই পুরো সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাটির আর্দ্রতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন আবহাওয়ায় লিচুর খোসা দ্রুত ফুলে ওঠে আবার সংকুচিত হয়। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফল ফেটে যায়। বিশেষ করে গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার লিচুচাষি আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমরা প্রতিবছরই কিছু না কিছু সমস্যার মুখোমুখি হই, কিন্তু এ বছরের মতো এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। কয়েক দিন আগেও প্রচণ্ড গরমে গাছের মাটি শুকিয়ে গিয়েছিল। এখন আবার হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়েছে। এতে লিচুর খোসা ফেটে যাচ্ছে। অনেক গাছে অর্ধেকের বেশি লিচুই নষ্ট হয়ে গেছে। যদি দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক না হয়, তাহলে আমাদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।’
গোদাগাড়ী উপজেলার আরেক চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লিচু চাষে অনেক খরচ। সার, কীটনাশক, শ্রমিক- সব মিলিয়ে বিনিয়োগ কম না। কিন্তু এখন যেভাবে লিচু ফেটে যাচ্ছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ। বৃষ্টি না থাকায় আমরা সেচ দিচ্ছি, কিন্তু হঠাৎ আর্দ্রতা বাড়ায় গাছের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই আবহাওয়া চলতে থাকলে পুরো মৌসুমটাই ঝুঁকিতে পড়বে।’
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি ফল চাষে পড়ছে। আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। লিচুর মতো সংবেদনশীল ফলে এর প্রভাব আরও বেশি।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘লিচু একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ফল। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সামান্য পরিবর্তনেও এর ওপর প্রভাব পড়ে। এ বছর যে ধরনের আবহাওয়ার ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, তা লিচুর জন্য অনুকূল নয়। আমরা কৃষকদের নিয়মিত হালকা সেচ দিতে বলছি, যাতে মাটির আর্দ্রতা স্থিতিশীল থাকে। একই সঙ্গে গাছের গোড়ায় মালচিং করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় শুকনো থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত পানি পেলে ফল ফেটে যায়। তাই সেচ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রাখা জরুরি। কৃষকদের আমরা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছি। এখনো সময় আছে, সঠিক পরিচর্যা করলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে আবহাওয়া যদি আরও অস্থির হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।’