শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে সোনালি স্বপ্নের বদলে মাঠজুড়ে এখন কেবল কৃষকের হাহাকার। ব্রি-৯৬ জাতের মোড়কে ভেজাল বীজের প্রতারণায় নিঃস্ব হওয়ার পথে শত শত কৃষক। সবুজ ধানখেতজুড়ে এখন হতাশার ছাপ। প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ফসল ধানের শিষ আসার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। এই সর্বনাশের দায় ডিলাররা পাশ কাটিয়ে গেলেও তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
ভালো ফসলের আশায় চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ব্রি-৯৬ জাতের বীজ বুনেছিলেন উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের কৃষকরা। সেই বীজই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। কারণ সবুজ ধানের বদলে নিস্তেজ ও মরে যাওয়া চারা পড়ে আছে জমিতে। শুধু দীঘিরপাড় নয়, একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। সেসব গ্রামের পাঁচ শতাধিক কৃষক এই বীজ বুনেছিলেন।
কৃষকদের অভিযোগ, ধানের শিষ আসার আগেই গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। এতে পুরো মৌসুমের ফসল প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।
ঝিনাইগাতী বাজারের মেসার্স নূরুল আমিন এন্টারপ্রাইজ ও সাব্বির বীজ ভান্ডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। তারা জানান, ওই দুই জায়গা থেকে ব্রি-৯৬ জাতের ধানের বীজ কিনেছিলেন তারা। এসব বীজ মধুপুরের একটি কোম্পানির নামে বাজারজাত করা হয়েছিল। কিন্তু বোনার পর দেখা যায় প্যাকেটের ভেতরে নিম্নমানের বীজ ছিল, ঘোষিত জাতের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, কেউ নিজের জমিতে, আবার কেউ বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। ফলে তাদের ক্ষতির বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করায় এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
দীঘিরপাড় চতল গ্রামের কৃষক আ. রশিদ চাঁন বলেন, ‘আমি ২০০ শতাংশ জমিতে ব্রি-৯৬ ধানের বীজ বুনেছিলাম। কিন্তু আমার খেতে ধানের শিষ বের হয়নি। অথচ ভালো ফলনের আশায় বেশি দামে বীজ কিনেছিলাম। এখন দেখি গাছই ঠিকমতো বড় হচ্ছে না। একরপ্রতি ৪০ হাজার টাকার বেশি খরচ হলেও সবটাই লোকসানের পথে।’
রামনগর গ্রামের কৃষক নওসেদ আলী বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে এই বীজ কিনেছিলাম। এখন দেখি জমিতে ধানই ঠিকমতো দাঁড়ায়নি। সব টাকা পানিতে গেল। আমরা গরিব মানুষ, সব সময় টাকা থাকে না। ধারদেনা করে ধান লাগিয়েছিলাম। এখন কীভাবে তা পরিশোধ করব?’
বন্দভাটপাড়া চতল গ্রামের কৃষক আ. হাকিম বলেন, ‘ঋণ নিয়ে চাষ করছি। ভেবেছিলাম ভালো ফলন হলে পরিশোধ করব। কিন্তু এখন তো কিছুই পাইনি। উল্টো দেনার বোঝা বাড়ছে। সরকার যেন এর ব্যবস্থা করে, আমাদের ক্ষতিপূরণ দেয়।’ একই গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, ‘বাজার থেকে ভালো মনে করেই বীজ কিনছিলাম। কিন্তু এই বীজে ধান হলো না। সরকার যদি আমাদের সাহায্য না করে, তাহলে আমরা পথে বসে যাব।’
এদিকে এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি বিভাগের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তারা দোষীদের শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ডিলার নূরুল আমিন দাবি করেন, তারা অনুমোদিত বীজই বিক্রি করেছেন। প্যাকেটের ভেতরে কী ছিল, তা তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তিনিও বিষয়টি তদন্তের দাবি জানান। তদন্ত হলে সব পরিষ্কার হবে বলে মত দেন তিনি। বলেন, ‘ওই বীজে ভেজাল থাকলে কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক। এতে আমাদের দোষারোপ করার কিছু নেই।’
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বীজের সঙ্গে উৎপাদিত ধানের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। কৃষকদের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।