চট্টগ্রামে ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বন্দরনগরীর বাসিন্দাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে, গভীর রাত ও নামাজের সময় বিদ্যুৎবিভ্রাট জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।
পিডিবি চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২০৯৮ মেগাওয়াট। এদিন জেলার চাহিদা ছিল ১৩৮১ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ২৬০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে পিডিবির লোডশেডিং ছিল ১৪৭ মেগাওয়াট। পিডিবির আওতায় চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও কয়েকটি উপজেলা সদর এবং কক্সবাজার সদর রয়েছে। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল ১১৩ মেগাওয়াট।
তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, পিডিবি বিদ্যুৎ সরবরাহের যে তথ্য দিচ্ছে বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। পুরো চট্টগ্রামে মাত্র ২৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং থাকলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ কেন যায়। কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও আসার খবর থাকে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মারাত্মক লোডশেডিং জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। প্রতিদিন জেলার বিশাল অংশে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি মেটাতে এলাকাভেদে দিনে-রাতে ১২ বার লোডশেডিং করা হচ্ছে। নগরীর অনেক এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিং–দুই সংকট মিলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় তাদের প্রস্তুতি বিঘ্নিত হচ্ছে। একাধিক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক পরীক্ষার সময় লোডশেডিং কমানোর দাবি জানিয়েছেন। নগরীর শুলকবহর এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, বাসায় আইপিএস আছে। কিন্তু আইপিএস দিয়ে কতক্ষণ চলা যায়। আমার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলের প্রস্তুতি ব্যাঘাত ঘটছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলের তীব্র সংকটে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় সেখানেও উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নগরীর হালিশহর এলাকার বাসিন্দা আবদুল আজিজ বলেন, ‘এই প্রচণ্ড গরমে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বাচ্চা আর বয়স্কদের নিয়ে আমরা খুবই কষ্টে আছি।’ হিলভিউ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মোবাশ্বেরা বেগম বলেন, ‘গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন বাচ্চারাও ঘুম থেকে জেগে যায়। এভাবে চলে না।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পাচ্ছি না। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বর্তমানে গভীর রাতে লোডশেডিংয়ের একমাত্র কারণ হলো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এই রিকশাগুলো রাতে বিদ্যুৎ টেনে নেয়।
খাতুনগঞ্জের লাল মিয়া সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আসাদ আসিফ বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে লবণ পরিশোধন ও প্যাকেজিং কার্যক্রম বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে আরেক ঘণ্টা থাকে না। আগে শ্রমিকরা একটানা কাজ করতে পারত। এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব কিন্তু পরবর্তী সময়ে পড়বে।
অন্যদিকে, নগরীর ইউনেসকো সিটি সেন্টারের ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম জানান, তাদের মার্কেটের জেনারেটরগুলো আর লোড নিতে পারছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই অতিষ্ঠ। যে কারণে তাদের বেচাকেনা কমে গেছে।