স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক ও কর কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কর সুবিধা বাড়ানো এবং স্থানীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়িসহ পরিবহন, স্বাস্থ্য খাতেও সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কৃষি খাতের উন্নয়নে দেশে স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর পুরোপুরি মওকুফ করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। স্থানীয়ভাবে জিংক সালফেট সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এর মূল কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব করা হয়। এমনকি কাজুবাদাম চাষকে উৎসাহ দিতে আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ ও দেশীয় শিল্পের প্রসারে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়।
পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্যজাত খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধার প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কতিপয় উপকরণ আমদানিকে রেয়াতি সুবিধা শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়।
কৃষির মতো স্বাস্থ্য খাতেও বিভিন্ন সুবিধার প্রস্তাব করা হয় বাজেটে। দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশের স্বার্থে এই শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যকিছু কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
এ ছাড়া কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে আরোপিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়। এমনকি মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মর্চুয়ারির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়।
ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধার প্রস্তাব করা হয়। দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তুলতে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়। জনস্বাস্থ্য খাতেও ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং ‘সার্কুলার ফিউচার মডেল’ বাস্তবায়নে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়।
ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) জনপ্রিয় করতে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে। পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা অনুরূপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান সমুদয় শুল্ক-কর এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস-ট্রাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ব্যতীত সমুদয় শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হয়।
প্রযুক্তি খাতে উন্নত বাংলাদেশ এবং আইটি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রেও সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
স্থানীয় শিল্পের বিকাশেও কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়। ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রস্তুতকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং এলপিজি সিলিন্ডার, অটো ট্যাঙ্ক এবং ভাল্ব উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়।
স্থানীয় ট্রান্সফরমার শিল্পকে শক্তিশালী করতে ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় ওয়াশিং মেশিন শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সব ধরনের হাউসহোল্ড টাইপ ওয়াশিং মেশিন আমদানির ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সাইকেলের যন্ত্রাংশ ‘ফ্রি হুইল’-এর বাজার সুরক্ষায় আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
দেশীয় কাগজ শিল্পের সুরক্ষায় গ্রিজপ্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপার আমদানির ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার পাশাপাশি ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। কপার তার ও টিউব উৎপাদনকারী শিল্পের সুরক্ষায় কপারের তার আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং কপার টিউব আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রি-ফ্র্যাক্টরি সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল বল ক্লেসহ পাঁচটি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিটারজেন্ট শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল লিনিয়ার অ্যালকাইল বেনজিন (এলএবি) আমদানির ক্ষেত্রে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ ও দেশীয় ফ্লোট গ্লাস শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ ধরনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় টায়ার ও টিউব উৎপাদনকারী শিল্পের দুটি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে স্কিন কেয়ার ও বিউটি প্রোডাক্টস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দুটি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নকে উৎসাহ দিতে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) পরিচালনায় প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর রেয়াত সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এভাবে বাজেট বক্তৃতায় বিভিন্ন খাতে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।