মেহেরপুরের গাংনীর গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে স্কচটেপে মোড়ানো বোমাসদৃশ বস্তু, সঙ্গে চাঁদা দাবি করে হত্যার হুমকি দিয়ে লেখা চিরকুট আর কাফনের কাপড়।
গত কয়েক মাসে মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০টির মতো বোমাসদৃশ বস্তু ও চিরকুট কিংবা কাফনের কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্ধার করা হয়েছে গাংনী উপজেলা থেকে। এ নিয়ে এই উপজেলার মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গাংনীর পাশাপাশি এসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলায়ও। তবে পুলিশ বলছে, বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার সকালে গাংনী উপজেলার জোড়পুকুরিয়া গ্রামে বাবলু মিয়ার মুদি দোকানের সামনে থেকে দুটি বোমাসদৃশ বস্তু ও এর সঙ্গে গ্রামের ১৮ বিএনপি নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে হত্যার হুমকিসংবলিত চিরকুট উদ্ধার করে পুলিশ। লাল স্কচটেপে মোড়ানো বোমা ও চিরকুট দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা থানায় খবর দেন।
রবিবার (১৭ ) মে রাতের কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা এই বোমা ও চিরকুট রেখে যায়। বাবলু মিয়া জোড়পুকুরিয়া গ্রামের মৃত রিয়াজুল মাস্টারের ছেলে। ওই চিরকুটে লেখা, ‘এক ঘণ্টা সময় পেলে বিএনপিদের কী হাল করব, ... পোলারা! লাভলুর মতো তোদের জবাই করব, পুলিশ আমাদের হয়ে কাজ করবে। আমরা ওদের টাকা দি।’
চিরকুটের আরেক অংশে লেখা, ‘শেখ হাসিনা আসবে ছয় মাস সময়, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। কুকুরের বাচ্চা বিএনপিদের কী হাল করব, ... পোলারা!’ এ ছাড়া চিঠিতে কয়েকটি অশ্লীল শব্দ লেখা রয়েছে।
এ বিষয়ে মুদি দোকানি বাবলু মিয়া বলেন, ‘ইতোপূর্বে আমার দোকানের সামনে ৪ থেকে ৫ বার চিরকুটের মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আমি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
এর আগে রবিবার সকালে একই উপজেলার কাজিপুর ইউনিয়নের হাড়াভাঙ্গা হাজিপাড়া এলাকায় বোমা, কাফনের কাপড় ও ৫ লাখ টাকা চাঁদার দাবি করা চিরকুট স্থানীয়দের চোখে পড়ে। আগের রাতের কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা ওই গ্রামের ইউসুফ আলীর বাড়ির প্রবেশপথে এসব রেখে যায়। ইউসুফের পরিবারের সদস্যরা এসব বস্তু দেখতে পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানান।
পুলিশ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বোমা, কাফনের কাপড় ও চিরকুট উদ্ধার করে। ইউসুফ আলী ওই গ্রামের ছইমুদ্দিনের ছেলে। তিনি একসময় প্রবাসে ছিলেন। বর্তমানে তিনি কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্থানীয়রা জানান, একটি পলিথিনে মোড়ানো বোমা, সাদা কাফনের কাপড় এবং হুমকিমূলক চিরকুট পাওয়া যায়। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আসসালামু আলাইকুম ইউসুফ, তুই সাবধান। তুই আর তোর ছোট সন্তান মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। পাঁচ লাখ টাকা রেডি কর।’
এ বিষয়ে ইউসুফ আলী বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো সকালে বাড়ির মেয়েরা ঝাড়ু দিতে গিয়ে প্রবেশপথে পলিথিনে কাফনের কাপড়ের সঙ্গে চিরকুট বাঁধা অবস্থায় বোমা দেখতে পান। পরে স্থানীয় মেম্বারকে খবর দিলে তিনি পুলিশকে জানান। পুলিশ এসে সেগুলো উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর থেকে আমি, আমার পরিবার ও আশপাশের লোকজন চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
এরও আগে চলতি মাসের গত ৬ মে সকালে উপজেলার সীমান্তবর্তী তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের হাজিপাড়ায় সানোয়ার হোসেন পলাশের বাড়ির গেট থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। এ বিষয়ে সানোয়ার হোসেন বলেন, বোমা গায়ে লেখা ছিল ‘হাত দিলেই ব্রাস্ট।’ তবে কে বা কারা, বোমা রেখেছে তিনি তা জানাতে পারেননি।
এর আগে গত ৩ মে উপজেলার চরগোয়াল গ্রামে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে লাল স্কচটেপে মোড়ানো একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। ওই গ্রামে এর আগে বেশ কয়েকটি বোমাসহ চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, বিগত কয়েক মাসের ব্যবধানে মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০টির কাছাকাছি বোমা ও হুমকি দেওয়া চিরকুট কিংবা কাফনের কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে। একের পর এক এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মেহেরপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাজেদুল হক মানিক বলেন, উদ্ধার করা বস্তুগুলো বোমা কি না, সেটি পুলিশ এখনো জানাতে পারেনি। প্রকৃত অর্থে সেগুলো কী? সেটি না জানতে পারলে আতঙ্ক কমবে না। তবে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মাথাচাড়া দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গাংনী থানার ওসি উত্তম কুমার দাস বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। এসব ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। এসব বিষয়ে মেহেরপুর জেলা পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।