সিলেট নগরীর গোয়াবাড়ি এলাকায় এক নারী পর্যটককে উত্ত্যক্তের ঘটনায় জেলাজুড়ে তোলপাড় চলছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী অভিযুক্ত কিশোরদের ধরে এনে প্রকাশ্যে কানধরে উঠবস করিয়ে বিচার করে ছেড়ে দেয়। তবে পুলিশ এখনো অভিযুক্তদের খুঁজে পায়নি। অভিযুক্তদের মাফ চাওয়া ও কানধরে উঠবসের ভিডিওটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে।
শনিবার (৩০ মে) গোয়াবাড়ি এলাকার আলী বাহার চা-বাগান এলাকায় নারী পর্যটককে উত্ত্যক্তের ঘটনা ঘটে।
এদিকে ঘটনাটি সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রমাণ বলে মন্তব্য করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল সেটা এখনো চলমান আছে। তাই এখনো মানুষজন অপরাধীদের ধরে নিয়ে পুলিশে না দিয়ে নিজেরা বিচার করে।
গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আশফিকা তাহসিন নামে এক তরুণী সিলেটের গোয়াবাড়ি এলাকায় ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন। তিনি হেনস্তা হওয়ার এই ঘটনা তার ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে লাইভ করেছেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, এই নারী পর্যটক চা বাগান এলাকায় ঘুরতে গিয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন। এ সময় কয়েকজন কিশোর ও তরুণ তাকে অনুসরণ করতে থাকে। ভিডিওতে ওই নারী অভিযোগ করেন, স্থানীয় কিছু যুবক তাকে উত্ত্যক্ত করছে এবং অশালীন আচরণ করছে। ভিডিও চলাকালীন দেখা যায়, নারী পর্যটক একসময় বলছেন, ‘তোমরা মেয়ে দেখো নাই?’ এই প্রশ্নের জবাবে উত্ত্যক্তকারী তরুণীদের অশোভনভাবে হাসতে দেখা যায়। এসময় একজন তরুণ ওই নারীর মোবাইল ক্যামেরার সামনে এসে পোজ দিতে ও আরেকজনকে সিগারেট টানতে টানতে উত্ত্যক্ত করতে দেখা যায়।
উত্ত্যক্তের শিকার নারী পর্যটকের দাবি, তিনি ওই তরুণদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেও অভিযুক্তরা সেখান থেকে সরে যায়নি। বরং তার পেছন পেছন আসতে থাকে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আশপাশে থাকা লোকজন ঘটনাটি দেখলেও কেউ প্রতিবাদ বা সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেননি।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই পর্যটন এলাকায় নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
তবে প্রশাসনিকভাবে কেউ কোনো উদ্যোগ নিতে না পারলেও স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা আজিজ খান সজিবের নেতৃত্বে স্থানীয় এলাকাবাসী শনিবার রাতেই ওই কিশোরদের আটক করে। এ সময় সালিশ করে অভিযুক্ত কিশোরদের মারধর, কানধরে উঠবস ও লাইভে ওই নারী পর্যটকের কাছে ক্ষমা চাইয়ে তাদের বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়।
ওই সালিশে উপস্থিত ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা আজিজ খান সজিব। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভিডিও দেখে এলাকার মানুষজন তিন কিশোরকে ধরে এনেছিল। তাদের বয়স ১২-১৩ বছর হবে। ওই কিশোরদের বাড়ি টুকেরবাজার ইউনিয়নের গোয়াবাড়ি, জাহাঙ্গীর নগর, উপর পাড়া এলাকায়। এলাকাবাসী তাদের মারধর করে। ওই কিশোররা উত্ত্যক্তের ঘটনায় ক্ষমা চায় ও কানধরে উঠবস করে। তাদের অভিভাবকরাও ক্ষমা চায়। এরপর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশকে না জানিয়ে সালিশে বিচার করে ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হয়েছে- এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘উত্ত্যক্তের শিকার নারী মামলা করলে তিন কিশোরকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে এমন আশ্বাস দিয়ে তাদের স্থানীয় ইউপি সদস্য সৈয়দ কাওছার আহমদ ও তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।’
এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি এলাকাবাসী তাদের ধরেছিল। তারা নিজেরা কানধরে উঠবস করিয়ে ওই ছেলেদের ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু তারা অভিযুক্তদের পুলিশের কাছে দেয়নি। তাদের আটক করতে গতকাল রাতেও পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। তাদের ধরতে পুলিশ এখনো তৎপর আছে। তাদের পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন আর আইনের শাসনের প্রতি মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই। তাই মানুষজন আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। নারী পর্যটককে ইভ টিজিং করে তার সঙ্গে যে অন্যায় করা হয়েছে তার প্রভাব সিলেটের পর্যটন খাতে পড়বে। পাশাপাশি সিলেটে নারীরা নিরাপদ নয় বলে দেশবাসীর কাছে উপস্থাপন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় ওই নারীর পাশাপাশি অভিযুক্ত কিশোরদের সঙ্গেও অন্যায় হয়েছে। তাদের যেভাবে প্রকাশ্যে লাইভে কানধরে উঠবস করিয়ে বিচার করা হলো এটা অন্যায়। কারণ শিশু কিশোরদের জন্য বিচারব্যবস্থা আলাদা। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের কাউন্সিলিং করতে হয়। তা না হলে অভিযুক্তরা আরও বিপদজনক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- এত কিছু ঘটে গেল, ফেসবুক লাইভে দেখানোও হলো, কিন্তু পুলিশ কাউকে খুঁজে পেল না। এই ঘটনাসহ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা প্রমাণ করে সিলেটে দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হচ্ছে।’
এসজি/