দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারসংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। বরং সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এমন বাস্তবতায় নতুন বাজেটে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগের কথা বলেছে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্পকলকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজও দিয়েছে সরকার।
বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় এক দশক ধরে জিডিপির ২২-২৩ শতাংশের আশেপাশে আটকে আছে। অথচ দেশের উন্নতির জন্য এই বিনিয়োগ কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হওয়া উচিত।
সরকার এবারের বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্প খাতে কর সুবিধা অব্যাহত রাখা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্কে অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগ, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসা সহজীকরণ উন্নত করার পরিকল্পনা। এ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেসরকারি খাতকেই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হলেও সেগুলো সমাধানের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি। শুধু সমস্যাগুলো উল্লেখ করলেই হবে না, বরং সেগুলো দূর করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হন। কেননা, শুধু বাজেটে প্রণোদনা বা ঘোষণা দিলেই বিনিয়োগ বাড়ে না; বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় বিষয়। বর্তমানে সেই আস্থার জায়গাটিই দুর্বল। তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদের হার নতুন বিনিয়োগে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছে। উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন না, আবার যারা পাচ্ছেন তাদের জন্য ঋণের খরচও বেড়েছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণে অনীহা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্প খাতের বড় উদ্বেগ। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে সতর্ক থাকছেন।
এই প্রসঙ্গে সাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সংস্কারের মাধ্যমে একটি প্রকৃত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হলেও সেগুলো সমাধানের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি। শুধু সমস্যাগুলো উল্লেখ করলেই হবে না, বরং সেগুলো দূর করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হন। তিনি বলেন, বাজেটে সরকারের ঘোষিত বিনিয়োগ উদ্যোগ আংশিক বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও স্বল্প সময়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি করা কঠিন হবে। কারণ অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশ এখনো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। কেননা, একই ধরনের শ্রমবাজার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে অন্য দেশে যাচ্ছে, কারণ সেখানে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ। শুধু কর রেয়াত দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আসে না; প্রয়োজন আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, মুনাফা স্থানান্তরের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু কর ছাড়, শুল্ক সুবিধা বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল ব্যবসা পরিবেশ, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অপরিহার্য। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করবে, কিন্তু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার উপযোগী পরিস্থিতি সৃষ্টি করা রাষ্ট্রেরই কাজ। এই পরিবেশ নিশ্চিত না হলে কেবল প্রণোদনা বা নীতিগত ঘোষণা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ অর্জন সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা নতুন নয়; বরং বাস্তবায়নই মূল সমস্যা। বিভিন্ন সময়ে কর অবকাশ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, দ্রুত অনুমোদনের মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, ভূমিসংকট, দুর্নীতি এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রেই নীতিগত ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে উদ্যোক্তারা প্রত্যাশিত সুবিধা পান না।
তাদের মতে, এবারের বাজেটে উৎস করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপণ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে উৎসে কর, পাঁচ বছরের কর কাঠামোর আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইলেকট্রিক যানবাহন খাতে কর ছাড়ের বিষয়টি বেশ প্রশংসার যোগ্য। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রিমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধানকে স্বাগত জানান তারা। তবে মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা ও সর্বোচ্চ আয়কর ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ হতাশাজনক। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি ও প্রযুক্তিপণ্যে কর হ্রাস দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করবে। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে সহায়ক হবে।
অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি (গ্যাস-বিদ্যুৎ) সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ঘন ঘন রাজস্বনীতি পরিবর্তন না করার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মীর নাসির। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য কর ছাড়ের চেয়েও বেশি প্রয়োজন নীতি-স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ। উদ্যোক্তা যদি মনে করেন আগামী বছর নীতিমালা বদলে যাবে, তাহলে তিনি বড় বিনিয়োগে যাবেন না। পাশাপাশি বাজেটে যেসব আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কাগজ-কলমে না রেখে মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে এর সুফল কতটুকু পৌঁছায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একই বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত সংস্কারের পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য। তবে বাজেটের ঘাটতি পূরণে সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ নির্ভর হয়, তাহলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি সরকার সত্যিকার অর্থে প্রশাসনিক বাধা কমাতে পারে, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে এবং নীতি-অনিশ্চয়তা দূর করে, তাহলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।